kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

হাজারো মানুষের মেহমানখানা

শেখ হাসান   

৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



হাজারো মানুষের মেহমানখানা

বিকেল তখন ৩টা। রাজধানীর লালমাটিয়া ডি-ব্লকের সড়ক ধরে এগোতেই চোখে পড়ে ফুটপাতের ওপর বিশাল ডেকচি। সেখানে রান্না তদারকি করছেন বাবুর্চি ইরাজ আহমদ। করোনার কারণে লকডাউনের সময় বহু দরিদ্র মানুষ বিপন্ন। আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুবেলা খাবারও জুটছে না। এই মানুষগুলোর জন্য কী করা যায় তা নিয়ে ভাবলেন এনজিওকর্মী সৈয়দ সাইফুল ইসলাম ও থিয়েটারকর্মী লিজা। দুজনেই ভাড়া থাকেন লালমাটিয়ায়। ভাবতে ভাবতে গত বছর যখন লকডাউন শুরু হয় বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় ওই এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলেন। পরে লকডাউন উঠে গেলে প্রতি সপ্তাহে এক দিন খাবার দিতেন দরিদ্র মানুষকে।

এবার যখন আবার সরকার ঘোষিত লকডাউন শুরু হয়, তৎপর হয়ে ওঠেন সাইফুল ও লিজা। সঙ্গে তাঁদের বন্ধুরাও। স্বল্প পরিসরে শুরু করা তাঁদের উদ্যোগ ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। এখন যেহেতু রোজা, প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁরা এক হাজার দরিদ্র মানুষের জন্য ইফতারির জন্য খিচুড়ির আয়োজন করছেন। তাঁদের এই আয়োজনকে সফল করে তুলছে একদল স্বেচ্ছাসেবী। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে পেরে তাঁরাও তৃপ্ত।

হাতে গ্লাভস পরে খাবার গোছাচ্ছিলেন ফখরুল অহিদ খান। তিনি বলেন, ‘আমি একজন স্বেচ্ছাসেবক। সরকারি চাকরি করি। রোজার শুরু থেকে বিকেলে এখানে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করছি।’

পাশে দেখা গেল কয়েকজন মিলে কেউ লেবু কাটছেন, কেউ বা শরবত তৈরি করছেন। তাঁদের একজন আয়েশা ফেরদৌসী। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি কুষ্টিয়া। সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করি। এখন স্কুল বন্ধ। মানুষের একটু সেবা করতে এখানে এসেছি। লিজা আমার ফেসবুক বন্ধু। সেই সূত্রে তাঁদের কার্যক্রম ফেসবুকে দেখতাম। পরে তাকে আমার আগ্রহের কথা জানালে এখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাই।’

ফুটপাতের ওপর স্বেচ্ছাসেবকদের তোড়জোড় চলছে দরিদ্র মানুষগুলোকে ইফতারি খাওয়ানোর। কেউ ঝাড়ু দিচ্ছেন, কেউ ত্রিপল বিছানোর কাজ করছেন। আবার কেউ করছেন স্টিলের প্লেট সাজানোর কাজ। এই মানুষগুলোকে উদ্যোক্তারা অবশ্য বলছেন তাঁদের মেহমান।

সাইফুল ও লিজা জানান, বর্তমানে প্রতিদিন এক হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করছেন তাঁরা। দিন দিন এ সংখ্য বাড়ছে। এর মধ্যে সিংহ ভাগ রিকশাচালক। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার পর রিকশাচালকরা আসতে শুরু করেন সেখানে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি রিকশা রেখে অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা। কোনো ধরনের হৈচৈ, হট্টগোল নেই। সন্ধ্যা ৬টার পর স্বেচ্ছাসেবকরা  সবার হাতে ইফতারি তুলে দেন।

সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন ও লিজা কোনোভাবেই নিজেদের মূল উদ্যোক্তা বলতে রাজি নন। তাঁদের কথা হচ্ছে—শুরুটা তাঁরা করেছেন বটে; কিন্তু অসংখ্য মানুষ তাঁদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

লিজা জানান, এই উদ্যোগে প্রথমে তাঁরা কাছের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে সহায়তা নিতেন। পরে বিষয়টি ফেসবুকে দেওয়ার পর অনেক মানুষ সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন। তবে তাঁরা বড় কোনো সহায়তা নেন না।

লিজা বলেন, ‘কেউ যদি আমাদের এক ট্রাক চাল দিতে চান, আমরা রাজি হই না। কারণ ওই চাল রাখার জায়গা নেই আমাদের। ফলে কেউ যখন আমাদের সহায়তা করতে চান তখন আমরা তাঁদের বলি ওই দিন কী কী প্রয়োজন। এর বেশি আমরা গ্রহণ করি না।’



সাতদিনের সেরা