kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কেটে ফুড কর্নার!

বিশেষ প্রতিনিধি   

৬ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কেটে ফুড কর্নার!

এরই মধ্যে কাটা পড়েছে কিছু গাছ। কাটার অপেক্ষায় আরো কিছু। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওয়াকওয়ে ও সাতটি ফুড কর্নার বানানোর জন্য কাটা পড়ছে ৪০-৫০টির মতো গাছ। স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় পৎসয়ের কাজের অংশ হিসেবে এই উন্নয়নকাজ চলছে বলে জানা গেছে। প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো এই গাছগুলো কাটা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক; শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় বইছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে স্থাপত্য অধিদপ্তর। স্থাপত্য অধিদপ্তরের এই মাস্টারপ্ল্যানের নকশা অনুসারে এই নির্মাণকাজ চালাচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই কাজের জন্য এরই মধ্যে বেশ কিছু গাছ কাটা হয়েছে। কাটার জন্য লাল দাগ দিয়ে আরো অনেক গাছ চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলে ৪০-৫০টি গাছ কাটা পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, আধুনিক নগর উপযোগী সবুজের আবহে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলা ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পৎসয়)’ শীর্ষক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। গৃহীত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু গাছ কর্তন করা হলেও প্রায় ১০০০ (এক হাজার) গাছ লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।”

গতকাল বুধবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা সুফি আব্দুল্লাহিল মারুফ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে খণ্ডিত তথ্য প্রচারিত হওয়ায় অনেকের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনে বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন ও ঘটনাসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এরই মধ্যে শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতাস্তম্ভ ও ভূগর্ভস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ যেমন : পাকিস্তানি শাসনবিরোধী ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত ভাস্কর্য স্থাপন, ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, ইন্দিরা মঞ্চ নির্মাণ, ওয়াটার বডি ও ফাউন্টেইন নির্মাণ, ভূগর্ভে ৫০০ গাড়ি রাখার কার পার্কিং ও শিশুপার্ক নির্মাণসহ ?বিভিন্ন নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া একটি মসজিদ, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনও নির্মাণ করা হচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে ঐতিহাসিক স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে শাহবাগ থানাও এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

রাজধানীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটা নিয়ে এরই মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। চারুকলার একদল শিক্ষার্থী স্থাপনা শিল্পকর্ম নির্মাণ করে গাছ কাটার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিবাদ চলছে। সবুজ প্রাঙ্গণের গাছ কেটে রেস্তোরাঁ নির্মাণের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রেস্তোরাঁ নয়, ফুড কর্নার নির্মাণ করা হবে। যেখান থেকে দর্শনার্থীদের জন্য খাবার বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে।

গতকাল বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি সংলগ্ন গেটে মানববন্ধনে কর্মসূচি পালন করেছে ‘নোঙর বাংলাদেশ’, ‘স্বাধীনতা উদ্যান সাংস্কৃতিক জোট’, ‘গ্রিন প্যানেট’ নামে তিনটি সংগঠন। মানববন্ধনে ‘আইনের পাঠশালা’র সভাপতি আইনজীবী সুব্রত কুমার দাস বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খাবারের দোকান বানানোর নামে প্রকৃতি হত্যার একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে করপোরেট সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। যার মূলে রয়েছে লুটপাটের অশুভ উদ্দেশ্য। অবিলম্বে এই প্রকৃতি হত্যার আয়োজন বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। উদ্যানকে সাংস্কৃতিক বলয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

তরুণ নাট্য নির্মাতা সুদীপ সজীব বলেন, ‘সৌন্দর্যবর্ধনের নামে গগনচুম্বী গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। যেখানে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রকৃতি বাঁচিয়ে রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে গাছ কেটে হাঁটার পথ, খাবারের দোকান বানানো হচ্ছে। একটু চেষ্টা করলেই গাছগুলো বাঁচানো যেত।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনও (পবা) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ ও নির্বিচারে গাছ নিধন বন্ধ করাসহ ৬ দফা সুপারিশ জানিয়েছে। গত সোমবার পবার একটি দল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কর্মযজ্ঞ সরেজমিন পরিদর্শন করে। পবার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকার টিকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সবুজ বলয়ের একটি। এখানে পুরনো গাছ কেটে রেস্টুরেন্ট ও ওয়াকওয়ে তৈরি করার নামে এটিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এখানকার গাছপালা, বন্য প্রাণী, বাস্তুসংস্থান, প্রতিবেশ সব কিছুকে সুরক্ষিত রেখেই এর উন্নয়ন করতে হবে।

 



সাতদিনের সেরা