kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বাল্কহেড

এক শ্রেণির ব্যবসায়ী আর্থিক লাভের জন্য এসব বালুবাহী জাহাজে পণ্য পরিবহন করছে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৩ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বাল্কহেড

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বা সাগরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য নামিয়ে পরিবহনের কাজটি করে লাইটার বা ছোট জাহাজ। এখন সেই কাজটি করছে বালুবাহী জাহাজ; যাকে ইংরেজিতে বাল্কহেড বলে। আর প্রচলিত ভাষায় বলা হয় ‘ভলগেট’। এই বাল্কহেডে বালু ছাড়া অন্য কোনো পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু কিছু শিপিং এজেন্ট, ঠিকাদার ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর মিলে অবৈধ এই কাজটি করে চলেছেন। আর তাতে করে বন্দরে জাহাজের প্রবেশপথ ও নৌপথ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জাহাজ মালিক, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর, শিপিং এজেন্ট, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল ও লাইটার জাহাজ ঠিকাদারদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর বৈঠক করে এই বাল্কহেড চলাচল বন্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেও রহস্যজনক কারণে সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ অবস্থায় সর্বশেষ গত শুক্রবার বন্দরের জাহাজ প্রবেশের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাল্কহেড জাহাজ দুর্ঘটনা বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে।

বন্দর চ্যানেলে বালুর জাহাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রধানত নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের। তারা কী করছে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসার পর তিন মাসে তাদের বিরুদ্ধে ১০০ মামলা করেছি; আটক হয়েছে অনেক বাল্কহেড জাহাজও। এর পরও নানা কৌশলে তারা অবৈধভাবে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’

নিজেদের লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকার কথা স্বীকার করে গিয়াস উদ্দিন আরো বলেন, ‘কোস্ট গার্ড আমাদের বাল্কহেড জাহাজ আটক করে দেয়। আমরা ওই জাহাজের বিরুদ্ধে মামলা দিই। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তো জাহাজ আটকে রাখতে পারি না। আবার অনেক বাল্কহেড জাহাজের কোনো নিবন্ধনই নেই। ফলে সেগুলো ধরাও কঠিন।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও নৌ বাণিজ্য দপ্তর যৌথভাবে অবৈধ এসব বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন বন্ধে অভিযান চালানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে এগুলো অবাধেই চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বলেন, ‘বাল্কহেড শুধু বালু তোলার কাজে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। এগুলোতে অন্য কোনো পণ্য পরিবহনের প্রশ্নই ওঠে না; আর বন্দর চ্যানেলে চলাচল তো সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা বাল্কহেড চলাচল বন্ধে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অনেক অভিযান চালিয়েছি, জরিমানা ও আটক করেছি। কিন্তু চলাচল বন্ধ করা যায়নি।’

ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বলেন, ‘শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর, আমদানিকারক ও শিপিং এজেন্টরা এসব ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে পণ্য পরিবহন বন্ধ করতে আন্তরিক না হলে আমাদের একার পক্ষে সেগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এখন তারা নিজেরাই আগে সিদ্ধান্ত নিক নিরাপদে পণ্য পরিবহন করবে, নাকি কম খরচে ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করবে!’

সম্প্রতি বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে বাল্কহেডে পণ্য নামানোর বেশ কিছু ছবি ও কিছু ভিডিও এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ‘গ্রিন ফনিক্স’ নামের বড় একটি জাহাজ  থেকে তিনটি বাল্কহেডে পণ্য নামানো হচ্ছে। নুর মোহাম্মদ-১, বিসমিল্লাহ ও মোহাম্মদ আলাউদ্দিন-১ নামের এই তিন বাল্কহেডে পণ্য নামানোর কাজটি করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হাজি ইদ্রিস অ্যান্ড সন্স। এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান নাহিদের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি। আর ৫৪ হাজার ৬০০ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল নিয়ে আসা গ্রিন ফনিক্স জাহাজটির শিপিং এজেন্ট এশিয়া বাল্ক। 

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের কারিগরি নকশা ছাড়াই মিস্ত্রি ও ওয়েল্ডারের পরিকল্পনায় এসব বাল্কহেড নির্মাণ করা হচ্ছে। এদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই। নির্মাণকারী ডকইয়ার্ডগুলোরও কোনো বৈধ অনুমতির কাগজপত্র নেই। দুই শতাধিক বাল্কহেড এখন পণ্য পরিবহনের অবৈধ কাজটি করছে।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নির্বাহী প্রধান মাহবুব রশীদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণশৈলীর কারণে বাল্কহেডে বালু ছাড়া অন্য পণ্য পরিবহনের অনুমোদন নেই। সামান্য বৃষ্টি বা ঝোড়ো বাতাসে সেগুলো ডুবে যেতে পারে। জাহাজটির পরিচালনাকারী সুকানিরা বহির্নোঙরে এসব জাহাজ পরিচালনায় একেবারেই অনভিজ্ঞ। তাঁদের কারণে এই চ্যানেলে দুর্ঘটনা শুধু বন্দর নয়; দেশের অর্থনীতির জন্যই বিপদ ডেকে আনবে।

মাহবুব রশীদ খান আরো বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী আর্থিক লাভের জন্য বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন করছেন। তাঁরা ঝুঁকি, বন্দর চ্যানেল, দেশের অর্থনীতি কোনো কিছুই বিবেচনায় নেন না। সুতরাং তাঁদের কঠোর শাস্তি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।



সাতদিনের সেরা