kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

নারায়ণগঞ্জে ৭ খুন

চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় মামলা

দুই বছর আগে আপিল হলেও শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়নি

এম বদি-উজ-জামান   

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় মামলা

আজ ২৭ এপ্রিল। সাত বছর আগে ২০১৪ সালের এই দিনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা পৃথক দুটি মামলায় হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতে রায় হওয়ার পর এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

কারাবন্দি আসামিরা দুই বছর আগে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধ আপিল দাখিল করলেও এই আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়নি বলে জানা গেছে। এ কারণে কবে চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হবে, তা কেউ বলতে পারছে না।

আইনজীবীরা বলছেন, কোন মামলায় কবে শুনানি হবে তা নির্ভর করে আদালতের ওপর। কেউ বলছেন, কোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আদালতে লিখিত আবেদন দিতে হবে। এ আবেদনের ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের কোনো মামলায় আপিল শুনানি হতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে মামলায় তাদের যুক্তিসহ পেপার বুক তৈরি করে আপিলের সঙ্গে তা দাখিল করতে হয়। এরপর পর্যায়ক্রম অনুসারে আদালতের কার্যতালিকায় আসে। পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলার সারসংক্ষেপ দাখিল করতে হয়। আলোচিত এই মামলায় এখনো কোনো পক্ষই সারসংক্ষেপ দাখিল করেনি। ফলে শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়নি। এই সারসংক্ষেপ দাখিলের পর শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসতে পারে।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় করা আপিল দ্রুত শুনানির উদ্যোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি

জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত এক বছর ধরে বিশেষ পরিস্থিতিতে (করোনাভাইরাস) আপিল বিভাগে পর্যায়ক্রম অনুসারে শুনানি হচ্ছে। যেসব মামলা বহু বছর ধরে পড়ে আছে, সেসব আগে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তবে এই মামলা যেহেতু বিশেষ মামলা, তাই যাতে দ্রুত শুনানি করা যায় সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ 

আসামিপক্ষে সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, এক বছর ধরে দেশে বিশেষ পরিস্থিতি চলছে। আদালতে স্বাভাবিক বিচারকাজ চলছে না। ফলে মামলায় এখনো সারসংক্ষেপ দাখিল করা হয়নি। তিনি বলেন, এই সারসংক্ষেপ দাখিলের পর পেপার বুক তৈরি হবে। এরপর শুনানি। 

সাত খুনের মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে আপিল করেন আসামিরা। এই আপিল এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। বিচারের প্রক্রিয়া অনুযায়ী আপিল বিভাগের রায়ের পর আসামি বা রাষ্ট্রপক্ষ রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পাবে। এই রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তির পর পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। যদি কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তবে তিনি কারাবিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ পাবেন। রাষ্ট্রপতি আবেদন নাকচ করে দিলে কারা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আর যদি আদালতে কারো মৃত্যুদণ্ডের সাজা না হয় সে ক্ষেত্রেও আসামিদের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে সাজা মওকুফের আবেদন দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

নারায়ণগঞ্জের আদালত ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি দুটি মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স (পূর্ণাঙ্গ রায়সহ সব নথি) পাঠানো হয় হাইকোর্টে। কারাবন্দি আসামিরা পর্যায়ক্রমে আপিল করেন। এই আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর একত্রে শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রায় দেন। দুটি মামলায় আলাদা আলাদা রায় দেন হাইকোর্ট। পরের বছর ১৯ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় (৭৮১ পৃষ্ঠা ও ৭৮৩ পৃষ্ঠা) প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ডের সাজার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালতে ৯ জনকে দেওয়া বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডের রায় বহাল থাকে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন ও নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর এবং অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিমকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় আলাদা দুটি হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ নূর হোসেন, তারেক সাঈদসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল আলাদা অভিযোগপত্র দেয়। তবে দুই মামলার অভিযোগপত্রেই আসামি অভিন্ন।

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ (সাবেক ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়ার জামাতা), কম্পানি কমান্ডার মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা (এম এম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সি, সৈনিক আল আমিন ও সৈনিক তাজুল ইসলাম এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন। এর মধ্যে নূর হোসেন ছাড়া বাকিরা র‌্যাব-১১-এর সাবেক সদস্য।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, সার্জেন্ট এনামুল কবীর এবং নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান (চার্চিল), আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আবুল বাশার, সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন।

বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত অন্য ৯ জন হলেন এএসআই আবুল কালাম আজাদ, এএসআই বজলুর রহমান, এএসআই কামাল হোসেন, করপোরাল মোখলেছুর রহমান, করপোরাল রুহুল আমিন, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, কনস্টেবল বাবুল হাসান, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান ও সৈনিক নুরুজ্জামান।