kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

‘লকডাউনে’ এক বাবার বাড়ি ফেরা

সজিব ঘোষ   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘লকডাউনে’ এক বাবার বাড়ি ফেরা

করোনা রোধে ‘কঠোর লকডাউনে’ গণপরিবহন বন্ধ। ওদিকে দ্বিতীয় রোজার সাহিরর সময় বাড়ি থেকে ফোন পেলেন শফিক আহাম্মেদ। চার বছরের কন্যাশিশুটি ভালো নেই। সন্তানের কাছে যেতে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। কিন্তু যাবেন কিভাবে? অসুস্থ সন্তানের জন্য ব্যাকুল বাবা টেলিফোনে বাড়ি ফেরার সেই বর্ণনাই দিয়েছেন কালের কণ্ঠকে।

সড়কপথে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের দূরত্ব ২২২ কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে বাসে বাড়ি পৌঁছতে তাঁর তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে। সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রয়োজনে হেঁটেই চলে যাবেন অসুস্থ সন্তানের পাশে। সারা দিন কাটল কর্মব্যস্ততায়। ইফতার শেষে ঢাকার হাজারীবাগের বাসা থেকে গোপালগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হলেন। ভেবে নিলেন, কিভাবে বাড়ি পৌঁছানো যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর পথেই মিলবে।

শফিক আহাম্মেদ প্রথমে রিকশায় ১৫০ টাকা ভাড়ায় পৌঁছলেন কল্যাণপুরে। সেখানে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি আর আলোচনার পর এক হাজার টাকার বিনিময়ে উঠে বসলেন কুরিয়ার সার্ভিসের বাগেরহাটগামী এক ভ্যানে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় ১২টা। ঢাকার বিভিন্ন স্পট ঘুরতেই সাহরির সময় হয়ে গেল। সাহরি সেরে ঢাকা থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছতে সকাল সাড়ে ৭টা বেজে গেল। তারপর ঘাটে সারা দিনের অপেক্ষা। কেননা দিনে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ফেরি চলাচল করে না। সন্ধ্যার পর ফেরি পার হয়ে রাত ১২টার কিছু সময় পর বাড়ি পৌঁছেন শফিক। এভাবেই সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন ৩০ ঘণ্টায়।

শফিক এখন গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। সেখান থেকে মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি আগে কখনো এভাবে বাড়ি ফিরিনি। এমনকি ঈদে বাড়ি ফিরতে কষ্ট হলে ঢাকায় ঈদ করেছি। হ্যাঁ, করোনা রোধে সরকারঘোষিত এই লকডাউনে আমি একপ্রকার নিয়ম ভেঙেছি, কিন্তু এমনটা করেছি বাধ্য হয়েই। সন্তান অসুস্থ, বাবা হয়ে আর থাকতে পারিনি।’

খুঁজলে শফিক আহাম্মেদের মতো আরো অনেককেই হয়তো পাওয়া যাবে। এই লকডাউনে তাদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার এমন গুরুত্বপূর্ণ অনেক কারণ আছে। তবে সবার ভাগ্যই শফিকের মতো নয়। ফেরি পার হতে গিয়ে পুলিশি বাধায় পড়ছে অনেকেই। মানবিক কারণে পুলিশ কাউকে কাউকে যেতে দিচ্ছে, আবার জরিমানাও করা হচ্ছে অনেককে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গতকাল রবিবার ১৮টি গাড়িকে জরিমানা করে পুলিশ। এর মধ্যেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ আরিচা-কাজিরহাট রুটে আট-দশজন যাত্রী নিয়ে ছোট ছোট ট্রলার চলাচল করছে। রাতের আঁধারে পণ্যবাহী ট্রাকেও এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে মানুষ।

আরিচা ঘাটে পুলিশের বাধায় ফেরিতে উঠতে না-পারাদের একজন আমেনা বেগম। এখানে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, ‘সরকারের আদেশ মানতে গিয়ে শৃঙ্খলার স্বার্থে আমাদের মাঝেমধ্যে কিছুটা অমানবিকই হতে হয়। বাসার জিনিসপত্র, ছোট বাচ্চা নিয়ে ঢাকা থেকে একেবারে বাড়ি চলে যাচ্ছে এক পরিবার। তাদের একবার আটকাইছি। আবার ভাবি, আটকাইয়াই বা কী হবে। ওই মহিলা বলছিল, ঢাকায় থেকে খাবে কী। শেষে চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দিলাম।’

মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার ওসি ফিরোজ কবির বললেন, ‘সরকারের নির্দেশ আমাদের মানতেই হবে। আমরা এখান দিয়ে কোনো মানুষকে পার হয়ে যেতে দিচ্ছি না। গাড়িগুলোকেও নজরদারি করা হচ্ছে। লকডাউনের প্রথম দিন মানুষের চাপ থাকলেও এখন তা নেই। তবে আমাদের অনুপস্থিতিতে লুকিয়ে ট্রলারে কিছু মানুষ পারাপার হয়ে থাকতে পারে।’