kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

কাটবে আঁধার মাসুদ রানার

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাটবে আঁধার মাসুদ রানার

বাজারে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। পরিত্যক্ত একটি চায়ের দোকানের সামনে টেবিল পেতে ইফতারির পসরা সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় মাস্ক পরা এক ভদ্রলোক। দ্বিতীয় রোজা থেকে একটু ব্যতিক্রমী ইফতারির আয়োজন নিয়ে বসেছেন তিনি। এ কারণে অনেকের চোখ তাঁর ইফতারির পসরাতেই। যে যার মতো ইফতারি নিয়ে চলে গেলেও কয়েকজনের চোখে ঠিকই ধরা পড়ল ওই বিক্রেতার মুখ। তিনি ময়মনসিংহের নান্দাইলের সিংরুইল উত্তরপাড়ায় মাসুদ রানা (৩৫)।

প্রায় ১০ বছর ধরে রেন্ট এ কারের ব্যবসা করছিলেন তিনি। ঢাকার ভাড়া বাসায় সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটছিল তাঁর জীবন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে দুই দিন তিনি প্রাইভেট কার নিয়ে নান্দাইলের গ্রামে এসে এই বাজারে বসেই বন্ধুদের নিয়ে জম্পেশ আড্ডায় মাততেন। গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। এখন সবই অতীত।

গেল বছর করোনার শুরুতেই লকডাউনে বিপাকে পড়ে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করে কোনো রকমে জীবন পার করছিলেন মাসুদ রানা। আগের মতো সংসারের ব্যয় মেটাতে না পেরে সন্তান ও স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়িতে। তবে নিজে হাল ছাড়েননি। পরে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করেন রেন্ট এ কারের ব্যবসা।

কিন্তু এখন আবার লকডাউনে চলছে না গাড়ি। আটকে গেছে জীবিকা। বাধ্য হয়ে মাসুদ রানাকে ফিরতে হলো গ্রামে জীবিকার খোঁজে। এই জীবিকার তাগিদে স্থানীয় বাজারে ভাই-ভাতিজাকে নিয়ে শুরু করেছেন ইফতারির ব্যবসা।

মাসুদ রানা জানান, তাঁরা পাঁচ ভাই, দুই বোন। ভালো রোজগারের আশায় বাবার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনেন দুটি প্রাইভেট কার। ব্যবসা প্রসারের কথা চিন্তা করে পরে চলে যান ঢাকায়। সেখানে উবারে গাড়ি চালানো শুরু করেন। কিছু দিন পর স্ত্রী-সন্তানদেরও ঢাকায় নিয়ে আসেন। সঙ্গে চলে আসেন রানার বড় ভাই আসিফুল ইসলাম সবুজও। ঢাকার শেরেবাংলানগর এলাকায় নেন একটি ভাড়া বাসা। গাড়ির ব্যবসা ভালো চলতে থাকলে বড় ভাইয়ের পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তাঁরাও পাশেই আরেকটি বাসায় ওঠেন। রানা দুই সন্তানকে ঢাকার একটি স্কুলে ভর্তি করান। দিনকাল ভালোই চলছিল। হঠাৎ করোনার ধাক্কায় ছেদ পড়ে ব্যবসায়।

মাসুদ রানা আরো জানান, করোনার প্রথম ঢেউয়ে বেকায়দায় পড়ে বেকার জীবন শুরু হয়। এর মধ্যে কিছু জমানো টাকা থাকলেও তা খরচ না করে নেমে পড়েন ঢাকাতেই বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকের কাজে। অন্যদিকে গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীকে দিয়ে করান হাঁস-মুরগি পালন। এর মধ্যে কমতে শুরু করে করোনার প্রাদুর্ভাব। নতুনভাবে আবার পথচলা শুরু হয়। পেছনে ফেলে আসা দুঃসহ জীবনের কথা ভোলার আগেই আবার করোনার হানা। গাড়ি চলছে না, তাই আয় বন্ধ। জমানো টাকাও শেষ। এই অবস্থায় কোনো উপায় না দেখে আবার বাধ্য হয়েই চলে আসতে হলো পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে। এখানে নতুন আয়ের পথ খুঁজে বের করাটাও কষ্টের।

রানা বলেন, ‘আগে এই বাজারে প্রতিবেশী ভাতিজার চায়ের দোকানে এসে আড্ডা দিতাম। এখন সেই চায়ের দোকান বন্ধ। এই অবস্থায় ভাতিজার সামান্য পুঁজি দিয়ে শুরু করেছি ইফতারির দোকান। নিজের পুঁজি দিয়ে জিনিসপত্র কিনে ভাতিজা তৈরি করে দেয় নানা ধরনের ইফতারি। এই আয় দিয়ে ঢিমেতালে সংসার চলছে।’

রানা বলেন, ‘জগদ্দল পাথর বুকে চেপে ধরেছে। কাউকে কিছু বলাও যায় না। কিস্তিতে গাড়ি কেনায় প্রতি মাসে ব্যাংকে পরিশোধ করতে হয় ২০ হাজার টাকা। গাড়ির ব্যবসা করে প্রতি মাসে যা আয় হতো তা থেকে কিস্তি দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চলত। এখন কী উপায় হবে, তা ভেবে কিনারা পাই না। এই দুঃসময় হয়তো থাকবে না। একদিন আবার রাজপথে চলবে গাড়ি। আঁধার কাটবেই।’