kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

পুকুরে সাঁতার না শিখিয়ে পুকুরচুরি

প্রকল্পের টাকা লোপাটের তথ্য-প্রমাণ সংসদীয় কমিটির হাতে

নিখিল ভদ্র   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পুকুরে সাঁতার না শিখিয়ে পুকুরচুরি

পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে ৪০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানোর একটি প্রকল্প হাতে নেয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা আগামী জুনে। প্রায় দুই কোটি ৫৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সংস্থা পিপলস এডুকেশন হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (পিইএইচডি) ফাউন্ডেশন। কাগজে-কলমে প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, তাড়াশ ও কাজীপুর; মুন্সীগঞ্জ সদর, লৌহজং ও মীরকাদিম এবং সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারা বাজার ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায়। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি সরেজমিনে গিয়ে আদতে শিশুদের সাঁতার শেখানো হচ্ছে এমন নজির প্রকল্প এলাকায় খুঁজে পায়নি।

উল্টো সাঁতার শেখানো হয়েছে এই মর্মে শিশুদের ভুয়া নাম ও তাদের অভিভাবকদের মনগড়া মোবাইল ফোন নম্বর জমা দিয়ে প্রকল্পের টাকা তুলে নিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। আর কোনো রকম তদারকি না করেই টাকা ছাড় করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ‘পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধকল্পে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক

প্রকল্প সম্পর্কে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে গেল বছরের নভেম্বরে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় প্রায় আড়াই কোটি টাকার ওই প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করে। উপসচিব জগদীশ চন্দ্র দেবনাথকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মাসুদুর রহমান ও সহকারী সচিব আফরোজা বেগম। কমিটি সরেজমিন তদন্ত করে এসংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের অনিয়মের অভিযোগ করেন সংসদ সদস্য ডা. আব্দুল আজিজ। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জের তাড়াশে সাঁতার প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে প্রকল্প কর্মকর্তা পরিবর্তন ও বিষয়টি তদন্তের দাবি করেন। পরে অভিযোগ তদন্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।

প্রকল্পটি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় সাঁতার শিখেছে বলে যে এক হাজার শিশুর তালিকা সরবরাহ করা হয়েছে তা ত্রুটিযুক্ত। প্রথম পৃষ্ঠায় যে নামের তালিকা রয়েছে, তা হুবহু তিন ও ১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় রয়েছে। এখানে শুধু ক্রমিক নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। আর তালিকায় বেশ কিছু প্রশিক্ষিত শিশু ও তাদের অভিভাবকসহ মোবাইল ফোন নম্বর দেওয়া হলেও সেগুলো ছিল মিথ্যা ও বানোয়াট। তালিকা অনুযায়ী সাঁতার প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছে এমন বেশ কয়েকজন শিশু প্রশিক্ষণ সম্পর্কে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে। কিছু শিশু সাঁতার শিখেছে বলে জানালেও কোন সময় সাঁতার শেখানো হয়েছে তারা জানাতে পারেনি। কেউ বলেছে শীতের আগে সাঁতার শিখেছে, কেউ বলেছে শীতের পরে। আবার কেউ কেউ বলেছে, শীতকালে সাঁতার শেখানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সরেজমিনে তদন্তের সময় প্রকল্প এলাকার শিশুরা যে জবাববন্দি দিয়েছে, তা ছিল শেখানো বুলির মতো। আবার নথিতে পুকুরের ছবি দেওয়া হলেও বাস্তবে ওই পুকুরের সঙ্গে ছবির মিল নেই। ফলে কমিটির কাছে সাঁতার প্রশিক্ষণের বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তবে অভিযোগের পর কিছু প্রশিক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া শিশুদের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সেটা হয়তো অভিযোগের পরে হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে উপজেলায় সাঁতার প্রশিক্ষণটি বাস্তবায়িত হয়েছে, সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বশীল উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাও জানেন না। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা তদারকি ও সঠিক তথ্য না জেনেই টাকা ছাড় দিয়েছেন। অবশ্য এ জন্য করোনা পরিস্থিতিতে অসুস্থতা ও ব্যস্ততাকে দায়ী করেছেন তিনি। আর প্রকল্প বাস্তবায়নকারী পিইএইচডি ফাউন্ডেশন তদন্তদলের কাছে দাবি করেছে, তারা শীতের আগে মহামারির সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাঁতার শিখিয়েছে।

এ ব্যাপারে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে সাঁতার প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কমিটির পরের বৈঠকে প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কমিটির সদস্য ডা. আব্দুল আজিজ এমপি। তিনি বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে শিশুদের সাঁতার শেখানো সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। অথচ প্রকল্পের আওতায় কারা সাঁতার শেখে, কারা শেখায়—সেটির কোনো তথ্য এলাকার কেউই জানে না। স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আমাকেও কিছু জানানো হয়নি।’