kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

আর ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলে না

আহমেদ নূর, সিলেট   

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আর ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলে না

বাউলশিল্পী বশিরউদ্দিন সরকার

‘চলবে আর কত কাল/ভাবি শুধু একা বসিয়া.../আমার ভাঙ্গা তরি ছেঁড়া পাল/চলবে আর কত কাল/ভাবি শুধু একা বসিয়া...।’ জনপ্রিয় এই বাউলগান কণ্ঠে নিয়ে কতবার যে মঞ্চে উঠে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দুলিয়েছেন সেই হিসাবটা নেই তাঁর। থাকবেই বা কিভাবে, দেশ-বিদেশে যেখানেই আমন্ত্রণ মিলেছে সেখানেই বিলিয়েছেন বাউলের সুরসুধা। হাজারো শ্রোতা সামনে রেখে কাঁপিয়েছেন মঞ্চ। তিনি কখনো ভাবনায়ই আনতে পারেননি করোনার ছোবলে জীবনটা হয়ে যাবে ছন্দহীন, ঠিক এই গানের মতো। এখন যেন সব কিছু থমকে আছে বাউলশিল্পী বশিরউদ্দিন সরকারের (৫৭)। কণ্ঠ-সুরই যে তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র বটিকা। কিন্তু করোনার কারণে নেই মঞ্চ, নেই বাউলের সুর। ফলে রোজগারও উঠেছে শিকায়। একেবারেই বদলে গেছে বাউল বশিরউদ্দিনের জীবনলিপি। খেয়ে না-খেয়ে কোনো রকমে পার করছেন করোনার অভিশপ্ত সময়।

বশিরউদ্দিন সরকারের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের মজলিসপুরে। প্রয়াত বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের শিষ্য তিনি। বয়স যখন ২১, তখন থেকেই ছিলেন বাউলসম্রাটের ছায়াতলে। ২০১৪ সাল থেকে তিনি স্ত্রী রোকেয়াকে নিয়ে সিলেট নগরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নোয়াপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকছেন। বশিরউদ্দিন জানান, করোনা মহামারির আগে বাউলগান কণ্ঠে তুলে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা উপার্জন করতেন। দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়লে গেল বছরের মার্চ থেকে বাউল মঞ্চে পর্দা নামে। সেই সময় থেকেই তাঁর রোজগারে ধরে চিড়।

বশিরউদ্দিন আরো জানান, আগে তাঁর আয়ের উৎস ছিল বাংলাদেশ বেতার, বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চে বাউলগানে সুর তুলে। করোনা শুরুর দিনগুলোতে ধারকর্জ করে চললেও এখন কেউ ঋণ দিতেও চায় না। আয় না থাকায় সাত মাসের ঘর ভাড়া বাকি পড়েছে। এরই মধ্যে এক থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণও জমেছে।

পারিবারিক পরিবেশের কারণেই ১০ বছর বয়সে বাউলগানের জগতে হাতেখড়ি বশিরউদ্দিনের। নানি করফুল নেছা প্রথম গুরু। এরপর কফিলউদ্দিন সরকারের সঙ্গে ছিলেন দীর্ঘদিন। তাঁর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে গেয়েছেন গান। ১৯৮৫ সালে তিনি বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কাছে শিষ্যত্ব নেন। এরপরই বাউলজগতে বাড়তে থাকে বশিরউদ্দিনের জনপ্রিয়তা। বাউল গীতিকার হিসেবেও তাঁর রয়েছে সুনাম। লিখেছেন পাঁচ শতাধিক গান। তাঁর প্রকাশিত বই রয়েছে চারটি। বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের তিনি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত লোকসংগীতশিল্পী। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ঢাকায় তিনি ২০১০ সালে শাহ আব্দুল করিমের গান নিয়ে আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী কর্মশালায় প্রশিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।

কুষ্টিয়ায় আন্তর্জাতিক বাউল মেলা, ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে একাধিকবার গান গেয়েছেন বশির। গেল বছরের শুরুতে ভারতের শিলচরে লোকনাথমন্দিরে পালাগান গেয়ে এসেছেন সেখানকার বাউল যাদন সরকারের সঙ্গে। আরো তিন-চারটি আসরের বুকিংও হয়েছিল; কিন্তু করোনার কারণে সেগুলো করা হয়নি। দুর্গাপূজায় সেখানে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, তা-ও হয়নি। শীতকালে দেশের বিভিন্ন আসরে গান গেয়ে যা আয় করতেন, তাতে অর্ধেক বছর চলে যেত। কিন্তু এ বছর তা-ও হয়নি।

বশিরউদ্দিন জানান, কাল পহেলা বৈশাখ। এ সময়টা তাঁর কতই না ব্যস্ততাই যেত। কোন মঞ্চের পর কোন মঞ্চে গাইবেন, সেই সূচি মেলাতে হতে হতো গলদঘর্ম। অথচ এবার করোনা পরিস্থিতিতে তাঁকে সুরহীন হয়ে ঘরবন্দি কাটাতে হবে। নিজের ভিটামাটি তো দূরের কথা, এক খণ্ড জমিও নেই। তাই মাথা গোঁজার জন্য যে গ্রামে চলে যাবেন, সে সুযোগও তাঁর নেই। ফলে স্ত্রীকে নিয়ে (সন্তান নেই) সিলেট শহরে কাটছে অনেকটা মানবেতর জীবন।

বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ঘনিষ্ঠ শিষ্য বশিরউদ্দিন সরকার ছলছল চোখে বলেন, “মৃত্যুর তিন দিন আগে শাহ করিম হাত মুঠো করে প্রতীকী কিছু একটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার ঠেখন নাই (তুমি আটকাবে না)’। আমি সেটা পকেটে রেখে দিয়েছিলাম।” তিনি বলেন, ‘গুরুর আশীর্বাদে গত এক যুগ ভালোই কেটেছে, জীবনে ঠেকতে হয়নি। কিন্তু মহামারি করোনা এত দিনের চেনাজানা জীবনটাকেই বদলে দিয়েছে। বশিরউদ্দিন সরকার আক্ষেপ করে বলেন, ‘জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হতে হবে, এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। ভালো-মন্দ খাবার কেনা তো দূরের কথা, জীবন বাঁচানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে। দিনে একবেলা খাই তো, পরের বেলা খেতে পারি না। লজ্জায় কারো কাছে হাতও পাততে পারি না।’

বশিরউদ্দিন আরো বলেন, ‘গান গাইলেই আয়, গানে ছেদ পড়লে রোজগারে ক্ষয়। এই দুঃসময়ে ওস্তাদ শাহ আব্দুল করিমের সেই বুলি মনে পড়ে, ‘দিন হতে দিন আসে যে কঠিন।’ আমার আগামীর দিনলিপিও যে কালো মেঘে আঁকা, তা এখনই করোনার দ্বিতীয় টেউয়ে টের পাচ্ছি।