kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

যেন ঈদ যাত্রার ঢল

ওমর ফারুক ও শরীফুল আলম সুমন   

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যেন ঈদ যাত্রার ঢল

বাস-ট্রেন বন্ধ। যে যেভাবে পারছে ঢাকা ছাড়ছে। মাওয়া ঘাটেও পড়েছে সেই চাপ। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামীকাল বুধবার থেকে আট দিনের সর্বাত্মক লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে অনেক মানুষই রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি। রাজধানীর প্রবেশমুখ গাবতলী, সায়েদাবাদ ও আব্দুল্লাহপুরে গতকাল সোমবার সকাল থেকেই ছিল মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। প্রবেশমুখগুলোতে দিনভরই ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। বেশির ভাগ মানুষই পিকআপ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজিচলিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ নানা যানবাহনে ঢাকা ছাড়ছে। কেউ কেউ কিছুটা পথ হেঁটেও যাচ্ছে। অনেককে আবার কম ভাড়ার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। 

ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ ছিল রাজধানীজুড়েই। অনেক জায়গাই ছিল যানজট। আবার বিভিন্ন বাস স্টপেজে মানুষকে ব্যাগ নিয়েও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। করোনার এত সতর্কতার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না, এমনকি অনেককে মাস্ক পরতেও দেখা যায়নি।

এদিকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে নামে গতকাল ঘরমুখী মানুষের ঢল। গেল রবিবার রাত থেকেই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ বেশি থাকলেও গতকাল সকাল থেকে দক্ষিণবঙ্গমুখী বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ বাড়তে থাকে ঘাটে। সেখানে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে হাজারো যানবাহন। এসব যানবাহনের মধ্যে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও ছোট গাড়ির সংখ্যাই বেশি।

এদিকে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও গতকাল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে পাটুরিয়া ঘাটে হাজার হাজার মানুষকে পারের অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাট এলাকায় ছোট গাড়ির চাপ বাড়তে থাকে। এ সময় লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ফেরিতে চাপ পড়ে।

গতকাল বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর গাবতলীতে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার এক পাশে প্রচণ্ড যানজট। আর গাবতলীতে ঢোকার মুখ থেকেই ব্যাগ নিয়ে মানুষের অপেক্ষা। আমিনবাজার ব্রিজের আগ পর্যন্ত গিজগিজ করছিল মানুষ। তবে ঢাকায় ঢোকার রাস্তা ছিল একেবারেই ফাঁকা। গাবতলী থেকে গতকাল দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।

ঢাকা ছাড়া মানুষের অতিরিক্ত চাপের কারণে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও সিনএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো। গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা গেছে, একাধিক মাইক্রোবাস বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রীদের ডাকাডাকি করছে।

ফরিদপুর ও রাজবাড়ী যেতে ৭০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আর পাটুরিয়া পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। এ ছাড়া প্রাইভেট কারে পাটুরিয়া পর্যন্ত একেকজনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। তারা একটি প্রাইভেট কারে নিচ্ছে কমপক্ষে চার যাত্রী। এ ছাড়া দামাদামি করলে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলগুলো চলছে। তবে আমিনবাজার ব্রিজের মুখ থেকে যেকোনো গাড়িতে উঠলে একটু কম ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে। তাই ওখানেই শ্রমজীবী মানুষের ভিড় বেশি। বিশেষ করে কোনো পিকআপ বা অন্য কোনো যানবাহন একটু ধীরে চললেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।

মো. আতিয়ারের বাড়ি মাগুরায়। তিনি মোবাইল অ্যাকসেসরিজ বেচেন মিরপুরের ফুটপাতে। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। কিন্তু গাবতলীতে এক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এমনিই বেচাকেনা নেই, এরপর লকডাউন হলে খাব কী? তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি। তবে প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাসে যে ভাড়া চায়, তাতে বাড়ি যেতে পারব কি না বুঝতে পারছি না।’

অনেকটা রাগ করেই কোনো গাড়িতে উঠতে না পেরে আমিনবাজার ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটা শুরু করলেন মো. আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘চকবাজারে কাজ করি। কাজে গেলে টাকা আছে, না গেলে নাই। এখন মালিক বলছে, লকডাউন হলে কাজ থাকবে না। তাই চলে যাচ্ছি।’ গাবতলীতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী পাওয়া গেল, যাঁরা ঢাকা ছাড়ছেন।

দুপুর আড়াইটার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, ব্যাগ নিয়ে অনেকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য টার্মিনালে আসছে। এর মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। তারা মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে রাজধানী ছাড়ছে।

কুমিল্লার চান্দিনায় যাওয়ার জন্য এসেছিলেন রাজমিস্ত্রি আব্দুল হাই। তিনি জানান, বুধবার থেকে কঠোর লকডাউন শুরুর খবর শুনে তিনি গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। লকডাউন শেষ হলে ফিরে আসার চিন্তা করছেন। মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে ব্যবসা করেন কিশোরগঞ্জের রতন মিয়া। তিনি কিশোরগঞ্জ যাওয়ার জন্য এসেছিলেন সায়েদাবাদ টার্মিনালে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা থাইকা কী করুম। লকডাউনের সময় দোকানপাট সব বন্ধ। না খায়া মরতে অইবো। মরতে অইলে বাড়িত গিয়া মরি।’ এ সময় পাশ থেকে এক যুবক চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এই সব খবর লয়া কী করবেন? সরকার আমাগো চিন্তা করে না। সরকার চিন্তা করে ধনী লোকদের ক্যামনে বাঁচানো যাইবো। এই কারণে লকডাউন দেয়। আমাগো তো করোনা অয় না। তা-ও আমাগোই বন্ধ রাখে। এই দেশের মানুষ না খায়া মরবো দেইখেন। হেইদিন আইতাছে।’

ঢাকা থেকে সিলেটে যাতায়াতকারী মিতালী পরিবহনের এক কন্ডাক্টর বলেন, ‘দুই দিন ধইরা রাইতে রাইতে গাড়ি চালাইতাছি। কোনো সমস্যায় এখনো পড়ি নাই। সেই জন্য আজকেও যাত্রী উঠাইতাছি।’

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও নিষেধাজ্ঞা না মেনে কিছু দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ (আঞ্চলিক) ও চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি]