kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

লণ্ডভণ্ড জীবনে জোড়াতালি

তৈমুর ফারুক তুষার   

১০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লণ্ডভণ্ড জীবনে জোড়াতালি

আসমা বেগম

তিন দশক আগে শিশুসন্তান কোলে স্বামীর ঘর ছেড়ে জীবন ও জীবিকার কঠিন সংগ্রাম শুরু করেছিলেন আসমা বেগম। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা ছেড়ে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। প্রথমে মেসে রান্না এবং পরে তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। বছর চারেক আগে সারা জীবনের সঞ্চয় সাত লাখ টাকা খোয়া যায়। এর পরও কারখানায় কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু গত বছর করোনার ঢেউ লণ্ডভণ্ড করে দেয় আসমার আপাত নিশ্চিত জীবন ও জীবিকা। নারায়ণগঞ্জে করোনার ব্যাপক প্রকোপ শুরু হলে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে জীবিকা বন্ধ, অন্যদিকে করোনার আতঙ্ক। আসমা বৃদ্ধ মায়ের কাছে তারাগঞ্জে চলে যান, কিন্তু বছর না ঘুরতেই সব সঞ্চয় ফুরিয়ে আসে। উপায়ান্তর না দেখে গত সোমবার তিনি ঢাকায় এসে গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচার একটি ফ্ল্যাটের গৃহকর্মী আসমা বেগমের সঙ্গে কালের কণ্ঠ’র কথা হয়। তিনি তুলে ধরেন তাঁর জীবিকার সংগ্রামের কথা। বর্ণনা করেন কিভাবে করোনা মহামারিতে তিনি পোশাক শ্রমিক থেকে গৃহকর্মী হলেন।

৫০ বছর বয়সী আসমা জানান, তাঁর বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুটি ইউনিয়নে। সেখান থেকে দুই যুগেরও বেশি সময় আগে নারায়ণগঞ্জে চলে এসেছিলেন শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে। দুই যুগ পোশাক কারখানায় কাজ করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সঞ্চয়ও চুরি হয়ে যায়। সেই কথা জানিয়ে আসমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বছর চারেক আগের কথা। দীর্ঘদিন গার্মেন্টে কাজ করে সাত লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। গ্রামে বাড়ি করার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। একদিন টাকাটা তুলে বাসায় আনলাম। পরের দিন আমার বাড়ি যাওয়ার কথা, কিন্তু ঘর থেকে টাকাটা চুরি হলো। থানায় মামলাও করেছিলাম, কিন্তু সেই টাকা আর উদ্ধার হয়নি। ফলে আমার এত বছরের সব সঞ্চয় হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেল। এর কিছুদিন পর আমার ছেলেটার ডিভোর্স হয়ে গেল। সে আর নারায়ণগঞ্জে থাকতে চাইল না, চট্টগ্রামে চলে গেল। আমি নারায়ণগঞ্জে একাই থেকে গেলাম।’

আসমার জীবনে একলা চলার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল আরো তিন দশক আগে। তারাগঞ্জের একজন বেকার লোকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে। আসমার ভাষায়, ‘লোকটা ছিল আধাপাগল। কাজকর্ম কিছু করত না। আমাকে কষ্ট দিত। আমার ছেলেটার বয়স যখন এক বছর, তখন আমি তাকে ছেড়ে চলে আসি।’

আসমা জানান, স্বামীকে ছেড়ে আসার পর কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন তিনি। পরে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। সেখানে মেসে রান্নার কাজ করেছেন। পরে গামের্েন্ট চাকরি নেন। ২০-২৫ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট এলাকায় থেকেছেন। সর্বশেষ পলমল গার্মেন্টে চাকরি করতেন তিনি। তিনি বলেন, “চার-পাঁচ হাজার টাকা করে ঘর ভাড়া দিতাম। কিছু টাকা খাওয়ার পেছনে খরচ হতো। বাকি টাকা জমাতাম। এর মধ্যে গত বছর করোনা শুরু হলো। নারায়ণগঞ্জে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছিল। ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিল। শহরে লকডাউনও শুরু হলো। একদিকে আয়-রোজগার বন্ধ অন্যদিকে মৃত্যুর ভয়। এর মধ্যে গ্রাম থেকে বারবার মা ফোন দিতে শুরু করল। উনি বয়স্ক মানুষ। কান্নাকাটি করে বললেন, ‘তুই আমার একমাত্র মেয়ে। এই রোগ কখন কারে ধরে তার ঠিক নাই। তুই বাড়ি চলে আয়।’ আমিও করোনার ভয়ে বাড়ি চলে গেলাম।”

করোনার প্রথম ঢেউ কমে গেলে গার্মেন্ট খোলা হলেও আর সেখানে ফেরেননি আসমা। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারখানায় অনেক মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে হয়। কার কখন করোনা হয় তার ঠিক নেই। তাঁরও ভয় ছিল, আর মা-ও আসতে দিতে চাইলেন না।

এখন ঢাকায় এসে গৃহকর্মীর কাজ নেওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আসমা বলেন, ‘গার্মেন্টে কাজ করে কিছু সঞ্চয় করেছিলাম। সেগুলো বাড়িতে বসে মাকে নিয়ে খরচ করছিলাম, কিন্তু কিছুদিন আগে সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। ফলে বিপদে পড়ে যাই। দিন চলছিল না।’ তিনি বলছিলেন, নিজের কোনো বাড়িও নেই। গ্রামে তিনি মায়ের সঙ্গে থাকতেন। মা থাকেন তাঁর ভাইদের সঙ্গে। ভাইয়ের স্ত্রীরাও আসমার উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছিলেন না। সে কারণে একটা কাজ খুঁজছিলেন। এমন সময় পরিচিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সেগুনবাগিচার বাসায় কাজটা পেয়ে যান।

আসমা বলেন, ‘মা ঢাকায় আসতে দিতে চান নাই, কিন্তু টাকা-পয়সা তো শেষ। ওদিকে চট্টগ্রামে ছেলেটারও তেমন রোজগার নাই। সেও কিছু দিতে পারছে না। সে বলে, লকডাউনের কারণে অটোরিকশার যাত্রী কমে গেছে। আগের মতো যাত্রী নাই। ফলে বাধ্য হয়েই ঢাকায় চলে এলাম।’