kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

‘শুধু খাই খাই করেন’ চেয়ারম্যান রানা

কাজল কায়েস, লক্ষ্মীপুর   

৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘শুধু খাই খাই করেন’ চেয়ারম্যান রানা

চেয়ারম্যান হোসেন রানা

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করে শুরু। এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে টাকা কামাচ্ছেন—এমন অভিযোগ করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ কয়েকটি দপ্তরে। একই অভিযোগ করে এর আগে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। যাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তিনি হলেন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হোসেন রানা। তিনি ইউনিয়ন শাখা আওয়ামী লীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতিও। তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিষদের তিনজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, চেয়ারম্যান রানা কোটিপতি হওয়া সত্ত্বেও ‘শুধু খাই খাই করেন’।

চেয়ারম্যান রানার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ থেকে জানা যায়, ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় তিনটি কাজে শ্রমিকদের তালিকায় প্রবাসী সাইফুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, মো. ছায়েদ, মৃত সিরাজুল ইসলাম, আবদুর রহমান, দেলোয়ার হোসেন ও খলিলুর রহমানের নাম রয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার, প্রকল্পের সভাপতি ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীদের  শ্রমিক দেখিয়ে তাঁদের নামে সোনালী ব্যাংক রামগঞ্জ শাখায় হিসাব খুলে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজে দরকারের কথা বলে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কাছ থেকে ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন জনপ্রতিনিধিরা। পরে ওই কাগজ ও ছবি ব্যবহার করে তাঁদের সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং ব্যাংক হিসাব খুলে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

৪০ বছর বয়সী চেয়ারম্যান রানার বিরুদ্ধে অব্যাহত স্বেচ্ছাচারিতা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) প্রশাসনিক কয়েকটি দপ্তরে লিখিত নালিশ করেন মো. জসিম উদ্দিন। তিনি ওই ইউনিয়নের উদনপাড়া গ্রামের সাদেক আলীর ছেলে। সাদেককে শ্রমিক দেখিয়ে সরকারি টাকা তুলে চেয়ারম্যান আত্মসাৎ করেছেন বলে ছেলের অভিযোগ। জসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, চেয়ারম্যানের দাপটে এলাকার মানুষ জিম্মি হয়ে আছে। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। টাকা ছাড়া এ ইউনিয়নে কোনো সেবা পাওয়া যায় না।

ইউনিয়নে ১০০ নারীর জন্য ভিজিডি কর্মসূচির চাল সহায়তার তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, চেয়ারম্যানের বোন আছিয়া খাতুন, তাঁর গাড়িচালক ফারুক হোসেন শেখের স্ত্রী নাছরিন বেগম, সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মেম্বার সুলতানা রাজিয়া, সাধারণ ওয়ার্ডের মেম্বার মেহেদী মাসুদের স্ত্রী তাহমিনা, ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন পাটওয়ারীর মা-বোন, আটজন প্রবাসীর স্ত্রী ও সচ্ছল কয়েকজন নারীর নাম রয়েছে। তালিকায় ভোলাকোট ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের আয়েশা বেগমের নামও রয়েছে। চেয়ারম্যানের বোন আছিয়ার স্বামী মোহাম্মদ আবুল হাসনাত সৌদি আরবপ্রবাসী। তাঁর পাকা ভবন থাকলেও সরকারি ঘর পেয়েছেন। গাড়িচালকের বাড়িতে পাকা ভবন রয়েছে। ভিজিডির তালিকায় থাকা অনেককেই নাম-ঠিকানা অনুযায়ী খোঁজ নিয়ে পাওয়া যায়নি। নোয়াগাঁও মুন্সিবাড়িতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী সাতটি পরিবার ভিজিডি কার্ড পেয়েছে। এটি চেয়ারম্যানের বোন আছিয়ার শ্বশুরবাড়ি।

টাকার বিনিময়ে বয়সের হেরফের করে জন্ম সনদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে রানার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হলে তিনি দোষ স্বীকার করে ভবিষ্যতে এমন হবে না মর্মে মুচলেকা দেন। রানার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ, তিনি নোয়াগাঁও গ্রামের মৃত মো. সিরাজুল ইসলামের এক ছেলেকে উত্তরাধিকার দেখিয়ে ওয়ারিশ সনদ দিয়ে তাঁদের ৫২ শতক জমি নিজের বোন আমেনা বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে নিয়েছেন। অথচ মৃত ওই ব্যক্তির পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। এ ঘটনায় রানার বিরুদ্ধে একটি মামলা বিচারাধীন।

২০১৬ সালের ২৬ জুলাই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় রানা উল্লেখ করেছেন, তাঁর মোট ১৫ লাখ টাকা, দুটি ফ্ল্যাটসহ কিছু মালপত্র আছে। কিন্তু তাঁর ঢাকার ইসলামপুর নবাববাড়ির গুলশান আরা সিটির পাইকারি থান কাপড়ের প্রতিষ্ঠান মোহনা ফ্যাব্রিকস ও নোয়াখালী বস্ত্র বিতান, গুদামঘর, ব্যক্তিগত কার্যালয়, গাড়ি, চীনে কার্যালয় থাকার কথা উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ঢাকার ডেমরার কোনাপাড়া শাহজালাল রোডের পাড়াডগাইর ২৩২/৬৫ হোল্ডিংয়ের সাততলা এবং ওই এলাকার ৩০৮ হোল্ডিংয়ে ৯ তলা বাড়ি থাকার কথাও গোপন করেছেন তিনি।

গত বছরের এপ্রিলে ঢাকার এক ব্যবসায়ীর করা ৩০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলায় জেল খেটেছেন রানা। এর আগে ২০ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুর আদালতে রানা ও তাঁর ৯ অনুসারীর বিরুদ্ধে আরেকটি অর্থ আত্মসাতের মামলা করা হয়। চেয়ারম্যানের ক্যাডাররা ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশ্যে ইউপি সদস্য শেখ ফরিদকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়। ছাত্রলীগ নেতা নিজাম উদ্দিনসহ কয়েকজনকে পেটানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের মাসিক সভা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কোনো সভা করেন না চেয়ারম্যান। কিন্তু পরে সুবিধামতো সময়ে রেজিস্ট্রার খাতায় সই দিতে সদস্যদের বাধ্য করেন।

রানার অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে গত ১৮ মার্চ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এর আগে গেল বছরের ১৫ জানুয়ারি টাকার বিনিময়ে সরকারি ঘর বরাদ্দ, গভীর নলকূপ বিতরণ, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতা, সোলার প্যানেল বিতরণে অনিয়মসহ দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে পরিষদের আটজন সদস্য (মেম্বার) চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দেন। বিষয়গুলো লিখিতভাবে দুদক ও জেলা প্রশাসককেও জানানো হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাহারে বাধ্য করানো হয়।

জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান মো. হোসেন রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মৃত ও প্রবাসীদের নাম দিয়ে মেম্বাররা টাকা উত্তোলন করলেও আমি জড়িত নই। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাঁরা (মেম্বার) আমার বিরুদ্ধে লেগেছে। সাংগঠনিক কারণ ও সামনে নির্বাচনের কারণে এখন অভিযোগগুলো সামনে আনা হচ্ছে। আমার বাড়ি গাড়ি ব্যবসার ওপর লোন আছে। আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। নির্বাচনের সময় আমি তড়িঘড়ি করে হলফনামা দিয়েছি, এ জন্য কিছু বাদ পড়তে পারে।’