kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৭ জুলাই ২০২১। ১৬ জিলহজ ১৪৪২

গাইবান্ধায় ছেলেসন্তান না হওয়ায় বিতাড়িত

আদালতে মামলা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন গৃহবধূ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আদালতে মামলা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন গৃহবধূ

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ছেলেসন্তান জন্ম না দিতে পারায় স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত সেই গৃহবধূ রোকসানা খাতুন অবশেষে আদালতে মামলা করেছেন। গতকাল রবিবার দুপুরে গাইবান্ধা নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্বামী রাজা মিয়াকে প্রধান আসামি করে পাঁচজনের নামে মামলাটি করেন তিনি। আদালতের কাছে তিনি সন্তানের পিতৃপরিচয় ও নির্যাতনের বিচার চেয়েছেন। এ সময় ১৩ দিন বয়সী মেয়েটি তাঁর কোলে ছিল। গত ১১ মার্চ চার দিনের নবজাতকসহ তাঁকে স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়।

মামলায় রাজার মা আছমা বেগম, বাবা মহব্বর আলী, ভাই আশরাফুল ও তাঁর (আশরাফুল) বউ আইরিন বেগমকে আসামি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক আবদুর রহমান পুলিশকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান রোকসানার আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাসিবুল হাসান হ্যাপী।

অভিযোগে জানা যায়, গত ৮ মার্চ রংপুরে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রোকসানা কন্যাসন্তান জন্ম দেন। চার দিন পর সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রতাপ (ঘোড়ামারা)

গ্রামে স্বামী রাজা মিয়ার বাড়িতে গেলে শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের অন্যরা তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। তখন থেকে তিনি বাবার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের ধনিয়ারকুড়া গ্রামে আছেন।

আদালতের বারান্দায় সন্তান কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে রোকসানা খাতুন বলেন, ‘মেয়েসন্তান জন্ম দেওয়াই আমার অপরাধ! এ ছাড়া দীর্ঘদিন থেকে যৌতুকের দাবিও ছিল তাদের। দিতে না পারায় রাজা মিয়া মিথ্যা অভিযোগে আমাকে ডিভোর্স করে। আমি স্বামীর শাস্তি চাই। আমার মতো কেউ যেন এভাবে স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত না হয়। আমি সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবিতে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব।’

মামলার বিবরণ ও রোকসানার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১০ জুন রাজা মিয়ার সঙ্গে তাঁর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। কিছুদিন পর অন্তঃসত্ত্বা হন রোকসানা। মাস চারেক পর গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জানতে আল্ট্রাসনোগ্রাম করান তাঁর স্বামী রাজা। আল্ট্রাসনোগ্রামে গর্ভের সন্তান মেয়ে জানার পর থেকেই রোকসানার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে রাজা ও পরিবারের লোকজন। পরে রোকসানাকে বাড়িতে রেখে ঢাকায় চলে যান রাজা। এরপর শ্বশুর-শাশুড়ি ও পরিবারের লোকজনের অন্যায়-অত্যাচার বাড়তে থাকে। তার পরও রোকসানা অনাগত সন্তানের কথা ভেবে সেখানেই থেকে যান। গত ৮ মার্চ তাঁর প্রসব বেদনা উঠলে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি পাশে দাঁড়াননি। ফুফুশাশুড়ি কোহিনুর বেগম আর মাকে নিয়ে রংপুরে যান রোকসানা। সেখানে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনে মেয়েসন্তান জন্ম দেন তিনি। তাঁর মা ধার করে ক্লিনিকের বিল পরিশোধ করে মেয়ে আর নাতনিকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

১১ মার্চ দুপুরে রোকসানা মেয়েসহ স্বামীর বাড়িতে গেলে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে সবাই সটকে পড়ে। রোকসানাকে শ্বশুর মহব্বর আলী তাড়িয়ে দেওয়ার সময় বলেন, ‘ছেলে রাজা তিন মাস আগেই রোকসানাকে তালাক দিয়েছে।’ পরে ৯৯৯-এ কল দিলে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাদুল্লাপুর থানা থেকে পুলিশ যায় রোকসানার স্বামীর বাড়িতে। কাউকে না পেয়ে রোকসানাকে বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয় পুলিশ।

রাজা মিয়ার দাবি, বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী পেটে বাচ্চা নিয়ে তাঁকে বিয়ে করেন। তাই বিয়ের এক মাস পরই তিনি স্ত্রীকে তালাক দেন। রাজা বলেন, সন্তানসম্ভাবনা থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যায় না, সে জন্য তিনি তালাকের বিষয়টি গোপন করেন।

এদিকে রোকসানা কোলের শিশুসহ দিনমজুর বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। তাঁর বাবার পক্ষে মেয়ে ও নাতনির ভরণ-পোষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন চরম অর্থাভাবে দিন কাটছে রোকসানা ও তাঁর নবজাতকের।

রোকসানার বাবা লুত্ফর রহমান মেয়ের চিকিৎসা, ওষুধ, নাতনির বাড়তি খাবার এবং মামলার অর্থের জন্য সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন।

রোকসানার আইনজীবী হাসিবুল ইসলাম হ্যাপী বলেন, ছেলেসন্তান জন্ম না দিতে পারায় রোকসানাকে স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করার চার দিনের মাথায় মিথ্যা অভিযোগে মেয়েশিশুসহ তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন দুই লাখ টাকা যৌতুক না পেয়ে রোকসানাকে নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের চিহ্ন রোকসানার শরীরে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশাবাদী রোকসানা ন্যায়বিচার পাবেন।’