kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

বিশেষ লেখা

অন্যদিন

ইমদাদুল হক মিলন

১২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অন্যদিন

বাংলাদেশে একটি পাক্ষিক পত্রিকা একটানা ২৫ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে, প্রকৃত অর্থেই এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। ‘অন্যদিন’ পত্রিকাটি এই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়েছে। ২৫ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ২৫ বছর পূর্তির এই শুভক্ষণে ‘অন্যদিন’ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম ও পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। গভীর গভীরতর ভালোবাসা।

আমার সৌভাগ্য ‘অন্যদিন’ শুরুর সংখ্যা থেকে পত্রিকাটির আমি যাত্রাসঙ্গী। অন্যদিনের এমন কোনো ঈদ সংখ্যা নেই, যে সংখ্যায় আমি লিখিনি। যতদূর মনে পড়ে, দু-তিনটি ঈদ সংখ্যা ছাড়া প্রায় প্রতিটি ঈদ সংখ্যায় আমি উপন্যাস লিখেছি। মাজহারদের সঙ্গে এমন একটা সম্পর্কে জড়িয়েছি, এক জীবনে এই সম্পর্ক ভাঙার নয়।

১৯৯৬ সালে পত্রিকাটি যাত্রা শুরু করে। আমার মনে আছে, এই পত্রিকার প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ঈদ সংখ্যার প্রচ্ছদ করা হয়েছিল দুজন লেখককে নিয়ে। একজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আরেকজন ইমদাদুল হক মিলন। শিরোনাম ছিল সম্ভবত ‘দুই বাংলার দুই জনপ্রিয় লেখক’। সবুজ মলাটের মাঝখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পাশে আমি বসে আছি। এই ঘটনা আমার লেখকজীবনের জন্য বিশাল প্রাপ্তি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পাশে আমি! লেখকজীবনের কত কত ঘটনার কথা ভুলে গেছি কিন্তু ‘অন্যদিন’ পত্রিকার এই ঘটনাটি ভুলিনি। ভোলা সম্ভবও নয়। ‘অন্যদিন’ যখনই ঈদ সংখ্যার প্রস্তুতি নিত, তখনই হয় মাজহার নয় নাসের নয় কমল নয় মাসুম অবিরাম টেলিফোন করে উপন্যাসের জন্য তাগিদ দিতেন। আহা, আমি যে কত ঘুরিয়েছি ওদের! এই দিচ্ছি এই দিচ্ছি করেও সময়মতো লেখা দিতে পারতাম না। মাজহার বলতেন, আপনার লেখা ছাড়া ‘অন্যদিন ঈদ সংখ্যা’ প্রকাশিত হবে না। আমার লেখা দিতে দেরি হওয়ার কারণে ‘অন্যদিন ঈদ সংখ্যার’ প্রকাশ অনেকবার পিছিয়ে গেছে।

দেশের সবচাইতে বড় ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে ‘অন্যদিন’। কমপক্ষে ১০টি উপন্যাস ছাপা হয়। গত ১০-১২ বছর ধরে ঈদ সংখ্যার প্রচ্ছদ করে দেন প্যারিসে বসবাস করা জগদ্বিখ্যাত বাঙালি শিল্পী শাহাবুদ্দিন। শাহাবুদ্দিনের প্রচ্ছদ ‘অন্যদিন’ পত্রিকাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে বসবাস করা কিংবদন্তি কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ একটার পর একটা ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছেন ‘অন্যদিনে’। এই ইতিহাস বাংলাদেশের অন্য কোনো পত্রিকার নেই। এমন অনেক বছর গেছে, ঈদ সংখ্যার জন্য একটিমাত্র উপন্যাস লিখেছেন হুমায়ূন ভাই। সেই উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে শুধু ‘অন্যদিনে’। বাংলাদেশের প্রত্যেক বড় লেখককে নিজের সঙ্গে যুক্ত করেছে ‘অন্যদিন’। এই পত্রিকা ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে প্রতিবছর।

আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করেছে ফ্যাশনজগতের কৃতী মানুষদের। ফুটবল নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে, ক্রিকেট নিয়ে করেছে। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের হাতে ‘অন্যদিন’ পৌঁছে দেওয়ার জন্য কলকাতায় বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। সেই অনুষ্ঠানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে বহু বড় লেখক উপস্থিত থেকেছেন। এও বাংলাদেশের পত্রিকাজগতে এক বিরল ঘটনা।

‘অন্যদিন’ প্রকাশের পরই মাজহাররা প্রতিষ্ঠা করলেন প্রকাশনা সংস্থা ‘অন্যপ্রকাশ’। ‘অন্যদিন’ পত্রিকাটি রুচিশীলতার ক্ষেত্রে যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, ‘অন্যপ্রকাশ’ও প্রকাশনাজগতে ঠিক সেই কাজটিই করল। বাংলাদেশের প্রকাশনাজগতে যুক্ত করল নতুন মাত্রা। অসামান্য প্রডাকশন তাদের এক একটি বইয়ের। রুচি ও নান্দনিকতায় ‘অন্যদিন’ এবং ‘অন্যপ্রকাশ’ অনন্য। হুমায়ূন আহমেদের কমপক্ষে দেড়শো বই তারা প্রকাশ করেছে। হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশক বলতে এখন বাংলাদেশের পাঠক ‘অন্যপ্রকাশ’কেই মনে করে। আমারও অনেক বইয়ের প্রকাশক ‘অন্যপ্রকাশ’।

আমাদের কথাসাহিত্যের জগিটকে দরিদ্র করে অকালে চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। অন্যদিন পত্রিকা এই মহান লেখকের স্মৃতি ধরে রাখবার জন্য এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় ২০১৫ সালে প্রবর্তন করল ‘অন্যদিন-এক্সিম ব্যাংক হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’। অগ্রজ কথাসাহিত্যিকদের সঙ্গে একজন করে নবীন লেখককেও প্রতিবছর পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সাহিত্যের জন্য এও এক বড় গৌরবের ঘটনা।

অন্যদিন পত্রিকার রজতজয়ন্তীর এই ক্ষণে পত্রিকাটির জন্য অপরিসীম শুভ কামনা। যেন আরো বহু বহু বছর ‘অন্যদিন’ তার নান্দনিকতা নিয়ে রুচিশীল পাঠক তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। বাঙালি জাতিকে যেন নতুন নতুন মেধাবী লেখক উপহার দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে। জয়তু ‘অন্যদিন’।

মন্তব্য