kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়

শিশুর অপরাধ যা-ই হোক, সাজা ১০ বছরের বেশি নয়

বিশেষ প্রতিনিধি   

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিশুর অপরাধ যা-ই হোক, সাজা ১০ বছরের বেশি নয়

কোনো মামলায় অভিযুক্ত শিশুর অপরাধ যে মাত্রারই হোক না কেন তাকে ১০ বছরের বেশি সাজা দেওয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত বলেছেন, কিশোরের বিচার (জুভেনাইল জাস্টিস) ব্যবস্থায় কোনো শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সাক্ষ্যমূল্য নেই। আর এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে সাজা দেওয়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অভিযুক্ত শিশুর অপরাধ যাই হোক না কেন তাকে ১০ বছরের বেশি সাজা দেওয়া যাবে না।

বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট সংক্ষিপ্ত রায় দিলেও সম্প্রতি এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। বেঞ্চের অন্য দুই বিচারপতি হলেন বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন। ৬৩ পৃষ্ঠার রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস। অন্য দুই বিচারপতি তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। বাংলাদেশ, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের একাধিক মামলার নজির এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির লেখা বই, নিবন্ধ, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল পর্যালোচনা করে এই রায় দেওয়া হয়েছে।

এক লাখ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সাত বছরের স্কুলছাত্র সৈকতকে হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা মো. সিদ্দিকুর রহমান নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানায় ২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন। এ মামলায় তদন্ত শেষে পুলিশ ওই বছরের ৩১ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয়। এরপর বিচার শেষে ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ছাত্র অলি আহম্মদকে মৃত্যুদণ্ড এবং সবুজ মিয়া ও তাপস সাহাকে যাবজ্জীবন দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪। মামলার আরেক আসামি আনিছ মিয়া শিশু হওয়ায় তাকে ১০ বছরের সাজা দেন একই আদালত। আনিছ মিয়াকে কিশোর আদালত হিসেবে এই আদালত রায় দেন। এরপর আইনানুযায়ী শিশুর অপরাধের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হতে পারে কি না—এ নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তুলে রায় বাতিল চেয়ে মো. আনিছ মিয়ার পক্ষে আবেদন করা হয়। এ অবস্থায় তিনজন বিচারপতিকে নিয়ে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়। এই আদালত ২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট সংক্ষিপ্ত রায় দেন। রায়ের আগে আদালত অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট এম আই ফারুকী ও ড. শাহদীন মালিকের বক্তব্য শোনেন। রায়ে আনিছ মিয়ার সাজা বাতিল করে তাকে মামলার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।

রায়ে বলা হয়েছে, শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ কিশোর বিচারব্যবস্থার ধারণার পরিপন্থী। নিউরোসায়েন্স ও সাইকোলজিক্যাল গবেষণা অনুযায়ী শিশুরা তাদের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নয়। শিশুরা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বস্তুত, মস্তিষ্কের (ব্রেইন) যে অংশ আবেগ ও যৌক্তিকতা নিয়ন্ত্রণ করে, শিশু অবস্থায় মস্তিষ্কের সেই অংশ পরিপক্ব হয় না। শিশুরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পরিণতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে না। এমনকি তার অভিভাবক বা মা-বাবার উপস্থিতি ছাড়াই যদি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তবে সে কি সত্য কথা বলতে পারে? মা-বাবা বা অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে তাদের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, ভীতির সঞ্চার হয়। তারা মুক্তির জন্য অসত্য বক্তব্য দিয়ে থাকে। স্পর্শকাতর মামলায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মা-বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় মা-বাবার খবর থাকে না। পরে এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর শিশুর আর মানসিক ভারসাম্য থাকে না। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা অপরাধের দোষ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাওয়ার প্রলোভনে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়ে যায়। এ কারণে আমরা শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ এবং তা তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারি না।

 

মন্তব্য