kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেই পুলিশের ছিনতাইকাণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি   

৪ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেই পুলিশের ছিনতাইকাণ্ড

প্রতীকী ছবি

পুলিশকে জনমুখী ও আস্থাশীল বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে চলছে ‘শুদ্ধি অভিযান’। মাদক, হয়রানি, নির্যাতনসহ যেকোনো অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এখন। আগের চেয়ে বাড়ছে বিভাগীয় শাস্তি ও গুরুদণ্ড। এমন এক পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের পুলিশ সদস্যদের ছিনতাইয়ের ঘটনায় নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যার পর গণবদলির মাধ্যমে উন্নত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়ার পর এই ঘটনা সবাইকে বিস্মিত করেছে।

জেলা পুলিশ দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ১ মার্চ কক্সবাজার শহর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) নুর-ই খোদা সিদ্দিকী ছিনতাইকাণ্ডে জড়িত হওয়ার আগে থেকেই ছিলেন বেপরোয়া। সিনহা হত্যার কিছুুদিন আগে কক্সবাজারে বদলি হয়ে যাওয়ার কারণে তখন তাঁকে বদলি করা হয়নি। চকরিয়া থানা থেকে কক্সবাজারে বদলি হয়ে আসা নুর পুরনো কর্মকর্তা হিসেবে দাপটের সঙ্গে অপকর্ম চালাচ্ছিলেন।

তবে জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ জড়িত থাকার ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়ায় পুলিশ সুপার (এসপি) দ্রুত ব্যবস্থা নেন। পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের নির্দেশনায় পুলিশকে জনমুখী ও আস্থাশীল বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে শুদ্ধি কার্যক্রম অন্যতম। এখন আগের চেয়ে শাস্তির ব্যাপকতা বাড়ছে। সম্প্রতি ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদকাসক্তির প্রমাণ মেলায় ঢাকায় ২৬ পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশে আগে কঠোর শাস্তির প্রচলন কম থাকায় অপরাধপ্রবণতা এখনো রয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বদলির ছকেই শাস্তি সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এখন গুরুদণ্ড দেওয়া হলে পুলিশের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা নিজেদের ঘরের ভেতর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে চাই। আমরা চেষ্টা করছি আগে নিজেদের ঘরকে শুদ্ধ করতে, দুর্নীতিমুক্ত করতে। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ১৫ হাজার ৪৬৯ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ১৪ হাজার ৬৪১ জনকে লঘুদণ্ড এবং ৭৫০ জনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭৩ জনকে বরখাস্ত এবং পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের মধ্যে শুধু আইজিপি কমপ্লেইন সেলে ২০১৭ সালে ৬১৯টি, ২০১৮ সালে এক হাজার ৩৭১টি, ২০২০ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত এক হাজার ৫০৩টি অভিযোগ এসেছে।

পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি-১৮৬১) অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তাঁর বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি ও বেতনবৃদ্ধি স্থগিত এবং বিভাগীয় মামলা করা হয়। মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইনস বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে এই ইউনিটের মোট এক হাজার ৯০১ পুলিশ সদস্য লঘু ও গুরুদণ্ড পেয়েছেন। এর মধ্যে লঘু শাস্তি পেয়েছেন এক হাজার ৫৯৩ জন। গুরুদণ্ড হয়েছে ৩০৮ জনের। এক বছরে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মাদকে জড়িয়ে পড়া ২৬ পুলিশ সদস্যসহ ৮০ জনকে। একইভাবে পুলিশের অন্যান্য ইউনিটেও শুদ্ধি অভিযান চলছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, এখন ঢাকা রেঞ্জ অফিসে বসেই সিসিটিভিতে ১৩ জেলার ৯৬ থানার সব কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে। থানার ডিউটি অফিসার বা গেটে সেন্ট্রিসহ অন্য কোনো পুলিশ সদস্য অমনোযোগী হলে তাত্ক্ষণিকভাবে বার্তা পাঠানো হয়। কোনো অপরাধ পেলেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। ঘুষসহ অন্যান্য অপরাধেও শাস্তির মুখোমুখি করা হয় পুলিশ সদস্যদের।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডোপ টেস্টের মাধ্যমে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মাদকাসক্তদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি আইনের পোশাক পরে কোনো সদস্য যাতে বেআইনি কাজে জড়িত না হন, সে জন্য বারবার কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। কেউ ফৌজদারি অপরাধে জড়ালে তাঁর নামে মামলা করা হচ্ছে। যদিও অনেক সময় ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বড় অপরাধে জড়ালেও ছোট সাজায় পার পাচ্ছেন পুলিশের কেউ কেউ। অপরাধে জড়ালে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর কিছুদিন পেরোলে আবার ভালো জায়গায় পদায়ন হচ্ছে, এমন নজিরও রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির উপদেষ্টা নূর খান লিটন বলেন, আগেও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠত। কয়েক বছরে টাকা-পয়সা নেওয়া, জমির দখল, এমনকি ব্যক্তিগত বিরোধে পড়ার মাত্রা বেড়েছে। তবে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার কিছুদিন পরই দেখা যায় তাঁরা স্বপদে বহাল। লঘুদণ্ড বেশি দেওয়ার কারণে অপরাধপ্রবণতা কমে না, এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তবে সম্প্রতি ডোপ টেস্টের মাধ্যমে চাকরিচ্যুতিসহ কিছু পদক্ষেপ ভালো হয়েছে। কক্সবাজারে গণবদলির পরও এখন ছিনতাইয়ের ঘটনাটিও ভাবতে হবে। আরো পদক্ষেপ প্রয়োজন।

কক্সবাজারের ঘটনার আগে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার এএসআই মাসুম এবং গেণ্ডারিয়া মিল ব্যারাকে রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) সদস্য সহিদের ছিনতাইকারীচক্রে জড়ানোর খবর সামনে আসে। এএসআই মাসুম নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে ছিনতাই করেন। মাঝেমধ্যে এই অপকর্মে সরকারি অস্ত্রও ব্যবহার করতেন তিনি।

কক্সবাজারের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, গণবদলির পর পাঁচ মাসে কক্সবাজারে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোথাও কোন দুর্নাম শোনা যায়নি। এ সময় সর্ববৃহৎ ইয়াবার চালান এবং বস্তাভর্তি টাকা জব্দ করে সারা দেশে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছিল পুলিশ। তবে ১ মার্চ কক্সবাজার শহর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই নুর-ই খোদা সিদ্দিকী, দুই কনস্টেবল আমিনুল মোমিন ও মামুন মোল্লা টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিজেদের জড়িয়ে পুলিশের ভাবমূর্তি ফের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চকরিয়ায় বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় এক সপ্তাহ আগে কক্সবাজার শহর পুলিশ ফাঁড়িতে বদলি করেন পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান। এলাকায় ‘ঘুষখোর’ বলেই পরিচিতি পেয়েছিলেন নুর। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন এখন অনেক অভিযোগ তুলছে। চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আইয়ুব মো. ইকবাল অভিযোগ করেন, জায়গার বিরোধ নিয়ে এলাকায় তাঁর ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে ২০২০ সালের ৭ অক্টোবর। হামলায় তাঁর পুরো শরীরে রক্তাক্ত জখম হয়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে থানায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই নুর। এরপর সরেজমিনে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মামলা করে দেওয়ার কথা বলে দুই দফায় ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি তাঁর প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে উল্টো আইয়ুবসহ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সহায়তা করেন এসআই নুর।

জানতে চাইলে পুলিশের চকরিয়া সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. তফিকুল আলম বলেন, নতুন বা পুরনো যা-ই হোক না কেন, কোনো পুলিশ সদস্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাঁকে অবশ্যই কঠিন শাস্তি পেতে হবে, যা এরই মধ্যে নুর-ই খোদা সিদ্দিকীর বেলায় ঘটেছে।

ছিনতাই করা টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি : এদিকে কক্সবাজার থেকে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, গত সোমবার কক্সবাজারের কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা রোজিনার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ছিনতাই করা তিন লাখ টাকার ব্যাগটি এখনো উদ্ধার হয়নি। এ ছাড়া আটক করা যায়নি ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া তিন পুলিশের অন্য দুই সহযোগীকে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের দেওয়া দুই দিনের সময় অনুযায়ী তিন পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ছিনতাইয়ের কাজে জড়িত অন্যদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।

 

মন্তব্য