kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

ভোটযুদ্ধের ‘উদ্যম’ সব দলে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভোটযুদ্ধের ‘উদ্যম’ সব দলে

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অংশ নিতে সব দলই নিজেদের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ তাদের ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে এবং বিএনপি নেতাকর্মীরা ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ছাড়াই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জাতীয় পার্টি দলীয় প্রতীকে অংশ নেবে কি না, সেটা চূড়ান্ত না হলেও ভোটের মাঠে থাকছে সেটা নিশ্চিত। আর বাম দলগুলো নিজেদের প্রতীকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটি এবং দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের আভাস মিলেছে। 

ভোটের মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি এরই মধ্যে দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে এবারের ইউপি নির্বাচনে নৌকা ও ধানের শীষের লড়াই না থাকায় নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে কি না তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে রয়েছে সংশয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতা এবং দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী হতে আগ্রহীরা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, এবারও ভোটযুদ্ধ জমবে।

দলীয় বিদ্রোহীদের প্রতি কঠোরই থাকবে আওয়ামী লীগ : আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে অংশ নেবে না বিএনপি। ধানের শীষ নির্বাচনে না থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের উৎসাহিত করবে না আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, কেউ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নৌকার বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে পারবেন না। প্রার্থী হলে থাকবে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে হারাতে হবে দলীয় পদও।

গতকাল দলীয় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রচার হয়েছে তা সত্য নয়। আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী কোনো সভায়ও এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপি ইউপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়ার পরও স্থানীয়ভাবে তাদের দল সমর্থিত প্রার্থীদের প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, দেউলিয়াত্বের তলায় গিয়ে ঠেকেছে বিএনপি। তারা জনগণ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এ কারণে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, এই নির্বাচনে বিএনপি না এলে আওয়ামী লীগ কী করবে তা সময় ও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থী হবেন বিএনপি নেতারা : দলীয় প্রতীকে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে এটা প্রমাণিত হয়েছে, এই নির্বাচন কমিশন কোনো নির্বাচনই নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করার যোগ্য নয়। তাই তারা দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আর থাকছে না। তবে যেসব ইউপি প্রার্থী বর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন বা যাঁরা এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবেও অংশ নিতে চান তাঁদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত কী? দলটির পক্ষ থেকে এখনো সুস্পষ্ট কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। যদিও দলটির সিনিয়র নেতারা বলছেন, ইউপি নির্বাচন বর্জনের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত সরকারের প্রতি একটি কঠোর বার্তা। এই নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে তারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও নির্দলীয় সরকারের অধীনে দাবি করবেন। এই নির্বাচনের বিষয়ে তৃণমূল নেতাদের কাছেও খুব দ্রুতই বার্তা যাবে।

ভবিষ্যতে সব নির্বাচনেই অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, এখন পর্যন্ত স্ট্যাডিং কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আমরা আর দলগতভাবে যাচ্ছি না। ইউনিয়ন পরিষদে আমাদের দলের কাউকে মনোনয়ন আর দিচ্ছি না। পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত হলে আপনাদের জানিয়ে দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, তৃণমূল নেতাদের প্রতি স্থায়ী কমিটিতে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘আমাদের কাছে বিভিন্নভাবে আমাদের তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানতে চাচ্ছেন, এখানে আমাদের অবস্থান কী হবে? আপনারা জানেন, এর আগে যখন পার্টির প্রতীক দিয়ে নির্বাচন করার প্রশ্ন এসেছিল, তখনই আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম, পার্টির মার্কা দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করাটা বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হবে না। তবে আমরা মনে করছি, বিএনপির যেসব নেতাকর্মী বা যাঁরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আছেন বা ছিলেন, তাঁরা যদি কেউ অংশ নিতে চান, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু মার্কা সে ক্ষেত্রে আমরা বরাদ্দ করব না।’

দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচনে যাবে না। তাই দলের কেউ যদি নির্বাচনে যান সেটি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। দলীয় পদে থেকে নির্বাচন করলে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন তিনি। সে ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি চলে আসবে। এই নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকারকে আরো বার্তা দিতে চাইছি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে করতে হবে। না হলে আমাদের পরবর্তী করণীয় আমরা ঘোষণা করব।’

দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে যেহেতু তৃণমূল নেতাদের স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়ানোর বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে ‘না’ করা হয়নি, সে ক্ষেত্রে কেউ কেউ হয়তো নির্বাচন করতে পারেন। আমাদের লক্ষ্য থাকবে দলীয় শৃঙ্খলা যাতে ভঙ্গ না হয়। সেটি হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জাপার সিদ্ধান্ত হবে প্রেসিডিয়াম সভায় : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নেবে কি না তা দলের প্রেসিডিয়ামের বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু। গতকাল সকালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তবে কবে নাগাদ প্রেসিডিয়াম সভা আহ্বান করা হতে পারে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করে জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু বলেন, সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতিকেই ভেঙেচুরে চুরমার করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন সরকারের অজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের প্রতি সাধারণ মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। মানুষ ভোট দিতে কেন্দ্রে যায় না। আওয়ামী লীগের লোকেরাও ভোটকেন্দ্রে যায় না।

তবে জাপার একটি সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, দলীয় প্রতীক নিয়েই জাপার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর দলীয় প্রতীকে না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাপার নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইউনিয়নগুলোতে সব দলের প্রার্থী প্রস্তুতি নিচ্ছেন : আমাদের আঞ্চলিক (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় নির্ধারণ হওয়ায় চাঙ্গা হয়ে উঠছেন ময়মনসিংহের নান্দাইলের ১৩টির মধ্যে ১১টি ইউনিয়নের সম্ভ্যব্য প্রার্থীরা। পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন ছাড়াও আগ্রহী প্রার্থীরা যে যাঁর মতো প্রচারে নেমেছেন।

বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরের বোয়ালমারীর গুনবহা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও আমি নির্বাচন করব। আর যদি প্রতীক না থাকে সে ক্ষেত্রেও আমি আবারও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেব।’

বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ১৫টি ইউনিয়ন রয়েছে। সব ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মন্তব্য