kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

ফের চাঙ্গা ইয়াবা কারবার

এস এম আজাদ   

৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফের চাঙ্গা ইয়াবা কারবার

মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানের পরও ইয়াবা কারবারের নেপথ্যের গডফাদাররা সক্রিয় রয়েছেন। অভিযানের শুরুতে কমলেও করোনা মহামারিতে ইয়াবা কারবার আবার বেড়েছে। গত ছয় মাসে অভিযান কমে যাওয়া, চিহ্নিত কারবারিদের জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং পলাতকরা এলাকায় ফেরায় কারবার ফের চাঙ্গা হয়েছে বলে মনে করছে এলাকাবাসী। শীর্ষ কারবারিদের বিচারের বাইরে থাকার ঘটনা অন্যদের ইয়াবার কারবারে উৎসাহী করে তুলছে। আত্মগোপনে থাকা প্রায় তিন ডজন কারবারিকে এখন দেখা যাচ্ছে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজারে। 

দুই দফায় ১২৩ কারবারি আত্মসমর্পণ করলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্তদের (পৃষ্ঠপোষকসহ ৭৩ জন) ৪০ জন আত্মসমর্পণ করেননি। গত এক বছরে ২৭ আত্মসমর্পণকারীসহ অন্তত ৪০ কারবারি জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। শীর্ষ কারবারিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলার মাধ্যমে তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে আছে। দুই বছরে মাত্র ১২ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত করে শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়নি এখনো। অন্যদিকে গত বছরের ৩১ জুলাই মেরিন ড্রাইভে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান খুন হওয়ার পর থেকে পুলিশের অভিযানে ভাটা পড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কারবারিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের স্থানীয় সূত্র, গোয়েন্দা সূত্র, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র মতে, ২০১৮ সালের ১৫ মে থেকে গত বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন ৫৮৬ জন। ধারাবাহিক অভিযানের কারণে আত্মগোপন করেন শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা। এক হাজার ১৫১ জন ইয়াবা কারবারির তালিকা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা সমন্বিত তালিকায় ৭৩ জনকে শীর্ষ ইয়াবা গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পুলিশের উদ্যোগে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন এবং গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ২১ জন কারবারি আত্মসমর্পণ করেন। তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২৪ জন শীর্ষ কারবারি প্রথম দফায় আত্মসমর্পণ করেন। তালিকায় ২ নম্বরে থাকা গডফাদার হাজি সাইফুল করিমসহ ৯ জন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণ করা ২১ জনের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কারবারি ছিলেন না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত বছরের ২৪ আগস্ট কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাটে মাছ ধরার ট্রলারে মিয়ানমার থেকে আনা ১৩ লাখ ইয়াবার বড় চালান জব্দ করে র‌্যাব। গত ছয় মাসে টেকনাফে র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড বেশ কয়েকটি বড় চালান জব্দ করেছে। যাঁরা আটক হয়েছেন তাঁরা মূলত ইয়াবার চালান বহনকারী। ইয়াবা কারবারিদের ফের সক্রিয় হওয়ার খবরে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসনও। গত ৯ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার চৌফলদণ্ডী সেতুর কাছে একটি মাছ ধরার ট্রলারে অভিযান চালিয়ে ১৪ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছে পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা জব্দে এটি পুলিশের বড় সাফল্য।

জানতে চাইলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণে কিছু শর্তের মাধ্যমে তারা আইনের আওতায় এসেছে। এরপর তাদের মামলা বিচারাধীন আছে। আইনগত প্রক্রিয়ায় আদালত থেকে জামিন পেতে পারে। তবে আমরা দেখব সে আবার ইয়াবা ব্যবসা করছে কি না, সে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে কি না। আবার ইয়াবা ব্যবসা করলে তার আত্মসমর্পণের শর্ত ভঙ্গ হবে। তখন আমরাও কঠোর হব।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কক্সবাজার-টেকনাফে আমাদের নজরদারি আছে।’

সূত্র জানায়, ইয়াবার গডফাদার তালিকায় ১ নম্বরে থাকা সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি, তাঁর ভাই মৌলভি মুজিব, শীলবনিয়াপাড়ার সাইফুল করিম, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তাঁর ছেলে শাহজাহান মিয়া, হুন্ডিসম্রাট জাফর ওরফে টিটি জাফর, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভি রফিক উদ্দীন, তাঁর ভাই ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভি আজিজ উদ্দীন, নাজিরপাড়ার নূরুল হক ভুট্টোসহ প্রভাবশালী ইয়াবা গডফাদারদের ৪০ জন আত্মসমর্পণ করেননি। এঁদের মধ্যে টিটি জাফর বিদেশে থাকলেও নাজিরপাড়ার ভুট্টো, মৌলভীপাড়ার এশরাম, আব্দুর রহমান, রেঙ্গুর বিলের মীর কাসিম এখন এলাকায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়ন মিলিয়ে ২৫ জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে তালিকায়। তাঁদের মধ্যে আটজন টেকনাফ হ্নীলা ইউনিয়নের জামাল হোসেন, নূরুল হুদা, সাবরাং ইউপির শামসুল আলম, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, রেজাউল করিম রেজু, সদর ইউপি মেম্বার এনামুল হক, পৌর কাউন্সিলর নূরুল বশর ওরফে নুরশাদ আত্মসমর্পণের পর জামিন পেয়ে ফিরেছেন এলাকায়। এ ছাড়া টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মৌলভি মুজিবুর রহমান, কাউন্সিলর শাহ আলম, রেজাউল করিম মানিক, মোহাম্মদ হোসেন, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মেম্বার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, আজম উল্লাহ, মোহাম্মদ আলম, সাবরাং ইউনিয়নের মাহমুদুর রহমান, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের রাকিব আহমদ, সিরাজুল মোস্তফা চৌধুরী লালু, শাহ আলম, সায়েদ আলম, মোজা আলম, ইউসুফ, সামবানু, মো. সিরাজ ও আবদুল আজিজ, হ্নীলা ইউনিয়নের শামসুল আলম ওরফে বাবুল, মোহাম্মদ আলী, নারী ইউপি সদস্য মরজিনা আকতার, আনোয়ারা ছিদ্দিকা আত্মসমর্পণ না করে আছেন এলাকায়। আত্মসমর্পণ করে বদির ভাই আবদুস শুক্কুর, আমিনুর রহমান ওরফে আব্দুল আমিন, ফয়সাল রহমান ও শফিকুল ইসলাম; ভাগিনা সাহেদ রহমান নিপু, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, খালাতো ভাই মংমং সেন ও বেয়াই শাহেদ কামাল জামিন নিয়ে ফিরেছেন। টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাবেক এমপি বদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাফর আহমদ; তাঁর চার ছেলে দিদার মিয়া, মোস্তাক মিয়া, শাহজাহান মিয়া ও ইলিয়াছের নাম রয়েছে তালিকায়। গত বছর বেনাপোলে গ্রেপ্তারের পর গত মাসে সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহজাহান জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে তাঁকে বরণ করে এলাকায় ফেরানো হয়।

মুক্তি মেলায় বাড়ছে শঙ্কা

২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণের সময় ১০২ জন তিন লাখ পিস ইয়াবা এবং ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। তখন তাঁদের প্রত্যেককে অস্ত্র ও মাদক আইনের দুটি মামলায় আসামি করা হয়। গত বছরের ২০ জানুয়ারি দুই মামলায় তাঁদের সবার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয় আদালতে। রাসেল নামের একজন আসামি জেলে মারা যান। সূত্র মতে, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট থেকে পাঁচজন জামিন পান। ৫ অক্টোবর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান সাতজন। ওই একই আদালত থেকে ৩ নভেম্বর জামিন পান ১৫ জন। তাঁদের সবাইকে এরই মধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এলাকার পরিস্থিতি জানতে চাইলে টেকনাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, যাঁরা কারাগারের বাইরে ছিলেন তাঁরা আত্মসমর্পণকারীদের সিন্ডিকেটেরই সদস্য। ফলে কারাগারে বসেও তাঁরা তাঁদের ইয়াবা সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন।

ঝিমিয়ে পড়েছে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কাজ 

আত্মসমর্পণের সময়ই ইয়াবা কারবারিদের অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব জব্দ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এই নির্দেশনা অনুযায়ী এক বছর তদন্ত করে ২০২০ সালের ২১ মার্চ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সিআইডির তদন্তে কিছু কারবারির শতকোটি টাকার সম্পদের তথ্যও মেলে। তবে অন্য কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি। জব্দ করা হয়নি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। এরপর আর এগোয়নি তদন্ত। 

জানতে চাইলে সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোস্তফা কামাল বলেন, ‘মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করার জন্য আমরা অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করেছিলাম। কাজ তো চলছে। তবে পরে আর মামলা হয়নি। অগ্রগতি কতটুকু তা খোঁজ নিয়ে জানতে হবে।’

মন্তব্য