kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

‘হেরা অসুস্থ প্রতিবন্ধী’

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘হেরা অসুস্থ প্রতিবন্ধী’

ভোটারের দীর্ঘ লাইন। বাইরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি। গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার চৌরা নয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গতকাল রবিবার সকাল ১০টার চিত্র।

৬ নম্বর বুথে ঢুকে দেখা গেল, ভোট দিতে কোনো ভোটার গোপন কক্ষে ঢুকলেই সঙ্গী হচ্ছেন পোলিং অফিসার সম্ভু চন্দ্র দে। ‘কোথায়, কিভাবে ভোট দিতে হবে’ বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

সাংবাদিক পরিচয় জানার পর সটকে পড়ার চেষ্টা করেন সম্ভু। ‘গোপন কক্ষে কাজ কী’ জানতে চাইলে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। পরক্ষণেই ভোট দিয়ে বের হয়ে আসা পৌরসভার বড়নগরের বাসিন্দা রুহুল আমিনকে (৪৫) দেখিয়ে বলেন, ‘তিনি ইভিএমে ভোট দিতে না পেরে ডেকেছিলেন। গিয়ে দেখিয়ে দিছি। আর কিছু না।’

তবে রুহুল আমিন বলেন, “হেরে আমি ডাকি নাই। উল্টা নিজেই গিয়ে মার্কা দেহাইয়া কইছে—‘এখানেই তো দিবেন, দেন!’ উনার জন্য আমি অন্য মার্কাতেও নিজের মতো করে ভোট দিতে পারি নাই।”

কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আবুল হোসাইন বলেন, ‘না ডাকলে পোলিং অফিসার গোপন কক্ষে যেতে পারেন না। তাঁকে সতর্ক করা হবে।’

সকাল সোয়া ১১টার দিকে কালীগঞ্জ আরআরএন সরকারি পাইলট স্কুল (পুরুষ) কেন্দ্রের ১ নম্বর বুথে গিয়ে দেখা গেল ভেতরে আওয়ামী লীগ নেতা মাইনুল ইসলাম, যুবলীগকর্মী সজিব ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো ভোটার ভোট দিতে গোপন কক্ষে ঢুকলেই সঙ্গে যাচ্ছেন যুবলীগকর্মী সজিব। বিভিন্ন বয়সী ১৩ জন ভোটারের সঙ্গে এই সজিবকে গোপন কক্ষে ঢুকতে দেখা গেছে।

ভোটারের সঙ্গে ঢুকছেন কেন—প্রশ্নের জবাবে সজিব ভোটারদের দেখিয়ে বলেন, ‘হেরা অসুস্থ। কেউ প্রতিবন্ধী। ইভিএমে ভোট দিতে পারেন না। তাই সাহায্য করছি।’ তাই বলে সবাই অসুুস্থ? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বুঝেনই তো; আমরা রাজনীতি করি, মানুষের সুবিধা-অসুবিধা দেখাই আমাদের কাজ। ভোটারদের সাহায্য করছি।’ অন্য কয়েকটি বুথেও ঢুকে দেখা গেছে একই চিত্র।

কালীগঞ্জ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে গতকাল একই চিত্র দেখা গেছে। কেন্দ্রের বাইরের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও প্রায় প্রতিটি বুথে ভোট দিতে গোপন কক্ষে যাওয়ার সময় পোলিং অফিসার অথবা এজেন্ট পরিচয়ে আওয়ামী লীগকর্মীরা ভোটারের সঙ্গে প্রবেশ করছেন।

দুপুর ১টার দিকে বালিগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ফরিদ আহম্মেদ বলেন, ‘গোপন কক্ষে অন্যদের উপস্থিতি থাকায় প্রায় সব কেন্দ্রেই মেয়রের ভোট ভোটাররা নিজেদের পছন্দে দিতে পারেননি। এসব বিষয়ে প্রিসাইডিং অফিসার ও রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়েও ফল পাইনি।’

দুপুর ২টার দিকে মসলিন কটন মিল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে কথা হয় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এস এম রবিন হোসেনের সঙ্গে। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। আমার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অহেতুক নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বা প্রশাসনের কেউ ভোটারের সঙ্গে গোপন কক্ষে প্রবেশ করেনি।’

প্রিসাইডিং অফিসার আলমগীর কবীর বলেন, ‘কালীগঞ্জে এবারই প্রথম সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ হচ্ছে। বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য এই পদ্ধতি কিছুটা বিড়ম্বনার। তাই প্রয়োজনে ভোট দিতে ভোটারকে সহায়তা দিতে পোলিং অফিসারদের প্রতি নির্দেশনা ছিল। কোনো বিশেষ প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করতে নয়। অনিয়ম বা কোনো প্রতীকের বিষয়ে ভোট দিতে বলার বিষয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।’ রিটার্নিং অফিসার কাজী ইস্তাফিজুল হক আকন্দ বলেন, ‘ভোটে অনিয়মের কোনো অভিযোগ পাইনি।’

মন্তব্য