kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

কুড়িগ্রামে অভাবে সন্তান বিক্রি

তিন মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন খলিল-মর্জিনা দম্পতি

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কুড়িগ্রামে অভাবে সন্তান বিক্রি

হতদরিদ্র খলিল মণ্ডলের (৪৮) বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের শিমুলতলা এলাকায়। বাড়ি, তা-ও কেবল নামেই। বাস্তবে নিজের ভিটেমাটি বলতে কিছু নেই। আগে দিনমজুরি করে সংসার চালালেও শারীরিক অক্ষমতায় সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী স্ত্রী মর্জিনা বেগমও কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে পরিবারটির। এ অবস্থায় সাত সন্তান নিয়ে দিশাহারা মা-বাবা। সপ্তাহখানেক আগে অভাবের তাড়নায় তিন মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তানকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন খলিল-মর্জিনা দম্পতি।

সরেজমিনে গতকাল শনিবার এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১৮ বছর আগে বিয়ে হয় খলিল মণ্ডল ও মর্জিনা বেগমের। ভিটেমাটি না থাকায় আশ্রয় মেলে উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ফকির মোহাম্মদ গুচ্ছগ্রামের একটি খুপরিঘরে। স্ত্রী ও একগাদা সন্তান নিয়ে সেখানেই কোনো রকমে মাথা গুঁজে থাকেন খলিল। আয়-রোজগার না থাকায় অভাবের সংসারে এতগুলো সন্তানের সামান্য খাবারের জোগান দেওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

খলিল-মর্জিনা দম্পতির প্রথম সন্তান কলিমা খাতুন (১২)  দুই হাজার টাকা বেতনে রংপুরের একটি বাসায় ঝিয়ের কাজ করছিল। বয়স কম হওয়ায় কাজ করতে না পাড়ায় সে বাড়ি ফিরে এসেছে। দ্বিতীয় সন্তান কলিম উদ্দিন জন্মের তিন মাসের মাথায় পুষ্টিহীনতায় মারা যায়। তৃতীয় সন্তান মিজানুর (৯), চতুর্থ সন্তান ইছানুর (৪) ও পঞ্চম সন্তান খুশি খাতুনকে (২) নিয়ে দিন কাটে অর্ধাহার-অনাহারে। অভাবের তাড়নায় তিন মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তানকে সপ্তাহখানেক আগে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন মা-বাবা। একই কারণে প্রায় ১৬ মাস আগে দুই দিনের এক সন্তানকে তাঁরা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। যদিও সেবার কোনো টাকা পায়নি পরিবারটি।

মর্জিনা বেগম বলেন, ‘হামরা গরিব মানুষ, টেহা পইসে নেই। অভাবে ছাওয়া বিক্রি করছি। ছাওয়া বেচা টেহা দিয়ে মোর স্বামী চিকিেস করবের নাগছে। না খায়া পড়ি মরলেও কোন মিম্বও-চেয়ারম্যান হামাক কিছু দেয় না।’

আইয়ুব আলী, দেনছাড় আলী, হালিমা বেগমসহ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, নদী ভাঙনকবলিত এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র। খলিল মণ্ডল কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ও শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। খেয়ে-না খেয়ে পড়ে থাকলেও কোনো মেম্বার-চেয়ারম্যান তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করেননি। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও মেলেনি।

বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া দাবি করেন, খলিলকে সরকারিভাবে নানা সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের আওতাভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁদের কার্ডের ব্যবস্থা করে দেব।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ‘ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। যেভাবে সম্ভব পরিবারটিকে সহযোগিতা করা হবে।’

 

মন্তব্য