kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

পাহাড়ে বন্ধ হচ্ছে না সশস্ত্র সন্ত্রাস

খুঁজতে হবে সমাধানসূত্র

রাঙামাটি প্রতিনিধি   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খুঁজতে হবে সমাধানসূত্র

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো বারবার সশস্ত্র সন্ত্রাসে জড়াচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করতে না পারলে এই মৃত্যুর মিছিল থেকে বের হওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন পাহাড় বিশ্লেষকরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে গভীরভাবে ভাবনার কথা জানিয়ে সরকারকে এই সংকটের সমাধানসূত্র খুঁজে বের করার তাগিদ অনুভব করছেন রাঙামাটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সরকারি অফিসে দিনে-দুপুরে ঢুকে একজন জনপ্রতিনিধিকে হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাঁরা।

উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় উপজেলা পরিষদ। যেখানে নিয়মিত অফিস করেন উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সরকারের উপজেলা পর্যায়ের সব কার্যালয়ের প্রধানরা। সেই আঙিনায় এমন ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন করে ভীতি ছড়িয়েছে পাহাড়ের মানুষের মনে।

এদিকে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদে ঢুকে সরকারি কর্মকর্তার সামনে জনপ্রতিনিধি (ইউপি সদস্য) সমর বিজয় চাকমাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় থানায় মামলা করা হয়েছে। বিজয় চাকমার স্বজন ইউপি সদস্য বিনয় চাকমা বাদী হয়ে গত বুধবার রাতে মামলাটি করেন। এদিকে বিজয় চাকমার লাশ খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনার পর পুরো উপজেলায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

বাঘাইছড়ি থানার ওসি আনোয়ার হোসেন খান জানান, মামলায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের সদস্য মনিময় চাকমা, বাঘাইছড়ির সাবেক চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমাসহ সংগঠনটির ১০ সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো ৮/৯ জনকে করা হয়েছে অচেনা আসামি।

গত বুধবার দুপুরে উপজেলা পরিষদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুন্নবী সরকারের কক্ষে কথা বলছিলেন রূপকারী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও জেএসএস (এমএন লারমা) গ্রুপের নেতা সমর বিজয় চাকমা। এ সময় দু-তিনজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী কক্ষে ঢুকে বিজয় চাকমার বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

কী ভাবছেন পাহাড়ের মানুষ : সরকারি কার্যালয়ে দিনে-দুপুরে সরকারি কর্মকর্তার সামনে জনপ্রতিনিধিকে হত্যা প্রসঙ্গে রাঙামাটির প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, ‘উপজেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র অবস্থায় এইভাবে একজন জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে হত্যা করে বীরদর্পে চলে যাওয়া কিসের আলামত বহন করে? সরকারকে অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে।’

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. মুছা মাতবর বলেন, ‘এর আগে একাধিক জনপ্রতিনিধিকে এভাবেই নৃশংস হত্যা করেছে আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসীরা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছি। সরকারি দলের নেতা হয়েও নানা কর্মসূচি পালন করেছি। যত দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের নির্মূূল করা যাবে না,তত দিন এই নির্মমতা বন্ধ হবে না।’

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, ‘এটা ন্যক্কারজনক ঘটনা, বাঘাইছড়ির জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন করা না হলে এসব চলতেই থাকবে।’

বাঘাইছড়ির পৌর মেয়র জাফর আলী খান বলেন, ‘এভাবে নিরাপত্তাহীন কাজ করা কঠিন। বারবার এমন ঘটনা ঘটে, আমরা প্রতিবাদ জানাই, কিন্তু অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এভাবে আর কত দিন?’

পার্বত্য নাগরিক পরিষদ রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অরক্ষিত। এসব সীমান্তে যত দিন অবাধ ব্যবহার বন্ধ করে অবৈধ অস্ত্রের যাতায়াত পথ রোধ করা  যাবে না, তত দিন পাহাড়ে শান্তি ফিরবে না।’

তবে আঞ্চলিক দলগুলোর এসব সশস্ত্র লড়াই নিয়ে কথা বলতে কখনই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না পাহাড়ি সুধীসমাজ কিংবা জনপ্রতিনিধিরা। ‘ভয়’ কিংবা ‘চাপ’র কথা বলে এড়িয়ে যান প্রসঙ্গটি।

তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই আঞ্চলিক দলগুলোও নিজেদের দায় নিতে অপারগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) আইনবিষয়ক সম্পাদক ও বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বলেন, ‘আমরা তো আক্রমণ করি না, আক্রমণের স্বীকার। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আমরা সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফের সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছি বারবার।’

অন্যদিকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিপ চাকমা বলেন, ‘আমাদের কোনো সশস্ত্র শাখা বা কর্মী নেই। আমরা চুক্তি বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম করছি। পাহাড়ে হত্যা, খুন ও গুমের কোনো ঘটনার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই।’

প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সংগঠক বাবলু চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে শান্তি বা অশান্তির দায় সরকারের। সরকার চাইলে এসব বন্ধ হবে, না চাইলে হবে না। সরকারকেই এসব বন্ধ করতে হবে।’

 

মন্তব্য