kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

জন্মশতবর্ষের স্মারক বত্তৃদ্ধতা

আহমদ শরীফ উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আহমদ শরীফ উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ

আহমদ শরীফ জন্মশতবর্ষ স্মারক বত্তৃদ্ধতা ও স্মারক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ছিলেন ড. আহমদ শরীফ। তিনি তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করে গেছেন। তাঁর মতো মানুষের এই সময়ে খুব প্রয়োজন ছিল। তিনি থাকলে দেশের বুদ্ধিজীবিতাচর্চা অনেক গতিশীল থাকত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এত নির্জীব হয়ে যেত না। কারণ তিনি যা চিন্তা করতেন তা মন-প্রাণ দিয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতেন।

ড. আহমদ শরীফ জন্মশতবর্ষ স্মারক বত্তৃদ্ধতায় তাঁকে এভাবেই স্মরণ করেছেন বিশিষ্টজনরা। গতকাল বুধবার জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত ‘ড. আহমদ শরীফ জন্মশতবর্ষ স্মারক বত্তৃদ্ধতা ও স্মারক পুরস্কার’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ড. আহমদ শরীফ জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটি।

কমিটির আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর পাঠানো লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়। বদরুদ্দীন উমর বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে ধান্দাবাজ লেখক সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের এক ধরনের পদচারণ আছে। ড. আহমদ শরীফ ধান্দাবাজ লেখক-সাহিত্যিকের কাতারে ছিলেন না। তিনি সব সময় এসব বিষয় এড়িয়ে চলতেন, এ কারণেই  তিনি অনন্য।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ড. আহমদ শরীফ সমাজ বদলানোর নিরন্তর চেষ্টায় রত ছিলেন। পাণ্ডিত্য, সাহিত্যচর্চার বাইরে যে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা, সেটা অনেকের মধ্যে থাকে না। তিনি সেটা অত্যন্ত সচেতনভাবে করেছেন। তিনি মধ্যযুগের পুঁথির অর্থ উদ্ধার এবং সেই পুঁথির ব্যাখ্যায় যে পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন, তা অন্য কেউ পারত না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আহমদ শরীফ সমাজ বিপ্লব চেয়েছিলেন। এই বিপ্লব কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়, পুরো বিশ্বের। আহমদ শরীফের জন্মের ১০০ বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন। তাঁরই ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই আহমদ শরীফের মধ্যে।’

‘আহমদ শরীফের মননশীল সাহিত্যে চিন্তার দর্শন’ শীর্ষক বক্তব্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লেখক ড. প্রথমা রায়মণ্ডল বলেন, আহমদ শরীফ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন চিন্তাশ্রয়ী ভাবনা, মতাদর্শ, মতবাদ, জ্ঞানবাদী প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার পরিসরকে স্পষ্ট ও সংহত করেছে।

উদযাপন কমিটির সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর বত্তৃদ্ধতায় বলেছেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. সুকুমার সেন প্রমুখ পণ্ডিত যে কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারেননি, ড. আহমদ শরীফ সেগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী শতবর্ষ স্মারক পুরস্কার গ্রহণ করে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘জীবনে কম পুরস্কার পাইনি। কিন্তু আজকের স্বীকৃতি আমাকে যেভাবে আন্দোলিত করেছে, অন্য কোনো পুরস্কার সেটা পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘ড. আহমদ শরীফের স্বপ্ন অনেক বড়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের সামান্য অংশ অর্জিত হয়েছে। মানুষের প্রকৃত মুক্তির জন্য অনেক কাজ বাকি। আমরা চেষ্টা করছি সেই পথে এগোতে। তিনি বেঁচে থাকলে যেভাবে এগোতে পারতাম, সেটা পারছি না। তবে চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের জন্য ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ পাস করাতে আহমদ শরীফ কতই না কাজ করেছেন। অথচ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি বিক্রি হয়ে গেছে—এই প্রশ্নও তোলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, আজকের বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় গেছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কেন পরিবহন শ্রমিক, গ্রামবাসীর সঙ্গে ঝগড়া করবেন?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, আহমদ শরীফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এর পেছনে বহু কারণ আছে, তার মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় কারণ।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার বলে তারা জঙ্গি দমন করছে। জঙ্গিদের নীতি হলো তাদের মতবাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না। আমরা তো দেখছি সরকারও তা-ই করছে। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না। তাহলে জঙ্গি দমন হচ্ছে কিভাবে?’

ড. আহমদ শরীফের ছেলে ড. নেহাল করিম তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার বাবা আমাদের সংস্কারমুক্ত রেখেছেন। এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কোনো কিছু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেননি। শুধু বলেছেন, মাথা উঁচু করে চলবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় শিক্ষকতায় যুক্ত থাকা ড. আহমদ শরীফ ১৯২১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

মন্তব্য