kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

একা হয়ে যাচ্ছেন কাদের মির্জা

কোম্পানীগঞ্জ থানার ১০ পুলিশ কর্মকর্তা একযোগে বদলি চান

তৈমুর ফারুক তুষার ও সামসুল হাসান মীরন   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




একা হয়ে যাচ্ছেন কাদের মির্জা

রাজনৈতিক মাঠে হঠাৎ করেই আলোচিত চরিত্র নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটের মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। সাম্প্রতিক সময়ে বেফাঁস কথন আর নানা কর্মকাণ্ডে বিব্রত তাঁর দল আওয়ামী লীগও। এর ফলে মির্জার সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বন্দ্বের পারদ দিন দিন চড়ছেই। এর পরও থামছে না কাদের মির্জার কথামালা।

মেয়র কাদের মির্জার সঙ্গে বিবাদের জাল শুধু নোয়াখালীতেই নয়, পাশের জেলা ফেনী আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যেও ছড়িয়েছে। দুজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকারের কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে দা-কুমড়া সম্পর্কে জড়িয়ে দলে এখন অনেকটাই একা তিনি। নিরুপায় কাদের মির্জা নিজ দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বহিষ্কারের দাবিতে হরতাল নিয়ে মাঠে নেমেছেন। ঘরের আগুন নেভাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনাও আমলে নিচ্ছে না কোনো পক্ষ। এ রকম প্রেক্ষাপটে কোম্পানীগঞ্জ থানার ১০ পুলিশ কর্মকর্তা একযোগে বদলি চেয়েছেন।

এদিকে গত ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাঁর ছোট ভাই কাদের মির্জাসহ কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে দলীয় কোন্দল ভুলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা মেনে চলতে সবাইকে নির্দেশনা দেন ওবায়দুল কাদের। তিনি গত এক মাসে বিভিন্ন সময় দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে বলেও নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন। এর পরও নোয়াখালী ও ফেনী আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে মির্জা কাদেরের বিবাদ আস্তে আস্তে সহিংস হয়ে উঠছে।

কাদের মির্জার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন নোয়াখালী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী, ফেনী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী, সোনাগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান ও ফেনী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, দাগনভূঞার উপজেলা চেয়ারম্যান ও ফেনী যুবলীগ সভাপতি দিদারুল কবির রতন, ফেনীর পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়ার চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, ফুলগাজীর চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিমসহ আরো অনেক নেতা। ফলে দলে এখন অনেকটাই কোণঠাসা কাদের মির্জা।

গেল এক মাসে কাদের মির্জা বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে একরামুল করিম চৌধুরী এমপি, নিজাম হাজারী এমপিসহ বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আহ্বান জানান। কাদের মির্জার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলতে থাকেন প্রতিপক্ষের নেতারাও।

সম্প্রতি পৌর মেয়র হিসেবে শপথ নিতে চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে ফেনীতে হামলার মুখে পড়ে কাদের মির্জার গাড়িবহর। এরপর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোম্পানীগঞ্জ চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ফখরুল ইসলাম সবুজ তাঁর অনুসারীদের নিয়ে টেকেরবাজারে কাদের মির্জার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলে সেখানে মির্জার সমর্থকরা হামলা করে। সংঘর্ষের খবর পেয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সবুজকে আটক করে থানায় নিয়ে আসার পথে তাঁর সমর্থকরা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে কাদের মির্জা অনুসারীদের নিয়ে থানা অবরোধ করেন। পরের দিন বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত কাদের মির্জা ফের থানা অবরোধ করেন। পরে তিনি দাবি পূরণে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে বৃহস্পতিবার বসুরহাট পৌর এলাকায় আধাবেলা হরতালের ডাক দেন। এরপরও দাবি পূরণ না হলে আজ শুক্রবার থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জ থানার সামনে অবস্থান করার ঘোষণা দেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। তাই আপাতত পুলিশ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছে না। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে পুলিশ তৎপর রয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ : গত মঙ্গলবার ফেনী শহরের একটি রেস্তোরাঁয় কাদের মির্জার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন সোনাগাজীর চেয়ারম্যান ও ফেনী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, দাগনভূঞার চেয়ারম্যান ও ফেনী যুবলীগ সভাপতি দিদারুল কবির রতন ও ফেনীর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী। লিখিত বক্তব্যে লিপটন অভিযোগ করেন, তারেক জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মির্জা কাদের বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে রক্ষা পাবেন না কাদের মির্জা। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে আবার কথা বললে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করা হবে।

গত বুধবার দুপুরে বসুরহাট পৌরসভা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কাদের মির্জা। তিনি বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলন করে ফেনীর মেয়র, দাগনভূঞার চেয়ারম্যান এবং সোনাগাজীর চেয়ারম্যান যে অভিযোগ এনেছেন তার একটি প্রমাণ করতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব এবং যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারেক জিয়ার সঙ্গে আঁতাতের রাজনীতি আমি করি না। যাঁরা বলেছেন তাঁরা ক্ষমতার জন্য, টাকার জন্য সব করেন। সে প্রমাণ আছে।’

কাদের মির্জার বিরুদ্ধে মাঠে হেফাজত : আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিবাদের মধ্যেই গত বুধবার কাদের মির্জার বিরুদ্ধে মাঠে নামে নোয়াখালী জেলা হেফাজতে ইসলাম। তারা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে মুফতি ইউনুছকে লাঞ্ছিত, ইসলামবিদ্বেষী ও অশালীন বক্তব্য প্রত্যাহার, আলেমদের সম্পর্কে মিথ্যা বক্তব্য ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং মাদরাসা বন্ধের প্রতিবাদে কাদের মির্জার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ওই দিন বিকেলে শহরের মাইজদীর বড় মসজিদ মোড়ে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা কাদের মির্জাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ১০ পুলিশ কর্মকর্তা একযোগে বদলি চান : এদিকে কোম্পানীগঞ্জ থানায় কর্মরত ১০ পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে একযোগে বদলির আবেদন করেছেন। তাঁরা হলেন এসআই সরোজ রতন আচার্য্য, এসআই জাকির হোসেন, এসআই শাহীদ হোসাইন, এসআই মো. নিজাম উদ্দিন, এসআই এমরান হোসাইন, এসআই রিয়াদুল হাসান, এএসআই বাবুল মিয়া বেগ, এএসআই মো. আবদুল জাহের, এএসআই মো. জহির হোসেন ও এএসআই রবিউল আলম। সবাই ব্যক্তিগত সমস্যা দেখিয়ে বদলির আবেদন করলেও একটি সূত্রে জানা যায়, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে না পেরে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনি বলেন, ১০ জনের বদলির আবেদন তাঁর কাছে জমা পড়েছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বদলির আবেদনকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘কোম্পানীগঞ্জে চলমান পরিস্থিতিতে সম্মানের সঙ্গে চাকরি করা এখন দুষ্কর। যে কারণে আমরা সম্মান থাকতে চলে যেতে চাইছি।’

বক্তব্য নেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের : নোয়াখালী ও ফেনীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কাদের মির্জার প্রকাশ্য বিবাদ ও বড় ধরনের সংঘর্ষের শঙ্কার বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাঁচজন কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা