kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

অভিমত

প্যারিস চুক্তির পর ভারতের জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্যারিস চুক্তির পর ভারতের জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি

প্যারিস চুক্তির পাঁচ বছর পর, ভারত সেসব উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা কেবল তাদের ‘সবুজ’ লক্ষ্যই পূরণ করে না, বরং আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী। সাম্প্রতিক জলবায়ু লক্ষ্য সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য আরো উঁচুতে স্থির করতে হবে; কেননা আমরা আমাদের অতীতের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না।’ তিনি যোগ করেছেন যে ভারত শুধু প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যই অর্জন করবে না, বরং তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘ ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে মোদি বলেছিলেন, এক টন প্রচারের চেয়ে এক আউন্স অনুশীলনের মূল্য বেশি। জলবায়ু কর্ম ও জলবায়ু লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে আমাদের সমাজের পুরো যাত্রায় আমরা জ্বালানি, শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং প্রাকৃতিক স্থানগুলোর সুরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাবহারিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।

ভারত অনুধাবন করে যে সাইলোর ভেতরে থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য লড়াই করা যায় না। এর জন্য একটি সংহত, বিস্তৃত ও সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবন এবং নতুন ও টেকসই প্রযুক্তি গ্রহণ করা। এই অপরিহার্য বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভারত তার জাতীয় উন্নয়নমূলক ও শিল্প কৌশলগত পরিকল্পনাগুলোতে জলবায়ুকে মূল ধারায় রেখেছে।

সব জলবায়ু কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি, ভারত একটি পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদনকারী উৎস থেকে নবায়নযোগ্য এবং অজীবাশ্ম জ্বালানি উৎসগুলোতে শক্তি রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছি।

ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারে আমরা লক্ষ্য রাখি। আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষমতা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং সক্ষমতা সম্প্রসারণের যে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম। এর বেশির ভাগ অংশই আসবে সূর্য থেকে, যা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস।

আমরা এরই মধ্যে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। আমরা প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আরো এগিয়ে গিয়ে আগামী দুই বছরে ২২০ গিগাওয়াট পেরিয়ে যাওয়ার আশা করছি। আরো বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে, ২০৩০ এর মধ্যে আমাদের ৪৫০ গিগাওয়াট লক্ষ্য রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে বিদ্যুৎ শক্তির ৪০ শতাংশ অজীবাশ্ম জ্বালানি উৎস থেকে উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনীতির নিঃসরণের তীব্রতাকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩-৩৫ শতাংশ হ্রাস করার লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে চলমান একটি সমান্তরাল প্রচেষ্টার সঙ্গে এই পরিষ্কার শক্তির উদ্যম হাত মিলিয়ে চলেছে।

এলইডি বাতি ব্যবহারের জাতীয় অভিযান ‘উজালা প্রকল্প’ প্রতিবছর কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করছে ৩৮.৫ মিলিয়ন টন। উজালা প্রকল্প, যার আওতায় ৮০ মিলিয়নেরও বেশি পরিবারকে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের সংযোগ সরবরাহ করা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিষ্কার শক্তি উদ্যোগ।

জলবায়ুবিষয়ক কার্যক্রম ও স্থায়িত্বকে সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে আনা হচ্ছে, যা একাধিক ক্ষেত্রজুড়ে বাস্তবায়নযোগ্য। ১০০টি শহরকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে আরো টেকসই ও অভিযোজিত হতে সহায়তা করার জন্য কাজ করছে আমাদের স্মার্ট সিটিস মিশন। আগামী চার বছরের মধ্যে বায়ুদূষণ (পিএম২.৫ এবং পিএম১০) ২০-৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

জল জীবন অভিযান, যার লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রামীণ ভারতের সব পরিবারে স্বতন্ত্র গৃহস্থালির কল সংযোগের মাধ্যমে নিরাপদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় জল সরবরাহ করা, এর একটি দৃঢ় স্থায়িত্বের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

আরো গাছ লাগানো হচ্ছে এবং একটি কার্বন ‘সিঙ্ক’ তৈরি করতে পতিত জমিগুলো পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে, যা আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিতে পারে।

আমরা সবুজ পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে কাজ করছি। বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে তার দূষণ নির্গমনের জন্য পরিচিত ক্ষেত্রগুলোকে পরিশোধনের জন্য দ্রুতবেগে কাজ করছি।

ভারতে নির্মিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের অবকাঠামো, যেমন—গণপরিবহনব্যবস্থা, গ্রিন হাইওয়ে ও নৌপথ। ই-মবিলিটি ইকোসিস্টেম নামক একটি জাতীয় বৈদ্যুতিক গতিশীলতা পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য ভারতের রাস্তায় সব যানবাহনের ৩০ শতাংশের বেশি যেন বৈদ্যুতিক হয়।

যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান, তাই এই উদ্যোগগুলো আমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই গ্রহণ করা হয়েছে।

আমরা স্বীকার করি, এখনো অনেক দীর্ঘ পথ যেতে হবে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলোর সুফল এরই মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ২০০৫-২০১৪ সময়কালে ভারতের কার্বন নিঃসরণের তীব্রতা ২১ শতাংশ কমেছে। পরের দশকে আমরা আরো অনেকটা কমিয়ে আনার প্রত্যাশা করছি।

ভারত জলবায়ু ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হতে আগ্রহী। আমরা কেবল আমাদের প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো ছাড়িয়ে যাচ্ছি না। আমরা জলবায়ু কর্মে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো এগিয়ে নিতে নানা উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

আমরা ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’ এবং ‘কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করেছি, যেগুলো কার্বন হ্রাসের জন্য বৈশ্বিক পথ তৈরিতে কাজ করছে। ৮০টিরও বেশি দেশ ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়েছে, যার ফলে এটি পরিণত হয়েছে দ্রুত বর্ধমান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একটিতে।

জাতীয় পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক নাগরিকত্বের এই সমন্বয় ভারতকে উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে; এবং এটি জলবায়ু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও কার্যক্রমে নেতৃস্থানীয় হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করার জন্য সঠিক কক্ষপথে রেখেছে।

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা : ভারতের পররাষ্ট্রসচিব। প্রকাশিত মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা