kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

নরসিংদী পৌর নির্বাচন

নৌকার প্রার্থীর পাশাপাশি এমপির তিন প্রার্থী!

হায়দার আলী ও মনিরুজ্জামান, নরসিংদী থেকে   

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নৌকার প্রার্থীর পাশাপাশি এমপির তিন প্রার্থী!

নরসিংদীর পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করতে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় এমপির তিন ঘনিষ্ঠজন। মেয়র পদে সদর আসনের এমপি নজরুল ইসলাম হীরুর ঘনিষ্ঠ চারজন মনোনয়নপত্র দাখিল করার পর একজনের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে এখন আছেন তিনজন। এই প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় আওয়ামী নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিরক্ত ও বিব্রত। তাঁরা এ কারণে নৌকা প্রতীকের পরাজয়ের আশঙ্কা করছেন। 

ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যাঁকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন, সেই প্রার্থীকে পরাজিত করতেই মাঠে জোরালোভাবে কাজ করছেন আওয়ামী লীগেরই এমপি নজরুল ইসলাম হীরুর ঘনিষ্ঠ তিন প্রার্থী। বিশেষ করে, নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করার মিশন নিয়েই মাঠে নেমেছেন তাঁরা। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বলছেন, নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী একজনই—হারুন অর রশিদ। আর নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন তিনজন। শুধু নৌকা আর ধানের শীষের প্রতীকের মধ্যে লড়াই হলে নৌকার জয় নিশ্চিত। কিন্তু বিদ্রোহী তিন প্রার্থী নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকলে নৌকার বিজয় কঠিন হয়ে যাবে। কারণ নৌকার সমর্থকদের ভোট কাটাকাটি হলে বিজয়ের পাল্লা বিএনপির দিকে ঝুঁকে যাবে। তাই তাঁরা কেন্দ্র থেকে নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে চাপ সৃষ্টি কিংবা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।

নরসিংদী পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে মোট সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত হয়ে নৌকা প্রতীকে মনোনয়নপত্র জমা দেন নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু। ধানের শীষের প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আসাদুল হক এবং স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) এস এম কাইয়ুম, নরসিংদীর মেয়র লোকমান হত্যার চার্জশিটভুক্ত আসামি ও শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফ হোসেন সরকার এবং শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রিপন সরকার। এর মধ্যে এস এম কাইয়ুম, আশরাফ হোসেন ও রিপন সরকার—তিনজনই এমপি হীরুর সমর্থিত নেতা বলে জানা গেছে।

নরসিংদীর আওয়ামী রাজনীতিতে দুটি গ্রুপ কাজ করছে বলে জানা গেছে। একটি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন ভুঁইয়া ও প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোট ভাই, বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলের গ্রুপ। অন্যটি এমপি হীরু ও লোকমান হত্যার আসামি মোন্তাজউদ্দিনের গ্রুপ।

নির্বাচনে নৌকার সমর্থন পেতে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চুসহ তিনজনের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। অন্য পক্ষ থেকে তিনজনের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় লোকমান হোসেন হত্যার চার্জশিটভুক্ত আসামী আশরাফ হোসেন সরকারকে। যিনি লোকমান খুনের বিষয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। সেই খুনের আসামিকে নৌকা প্রতীক দেওয়ার পর এমপি হীরু ও তাঁর সমর্থকরা খুশি হলেও জেলা আওয়ামী লীগসহ সব অঙ্গসংগঠনের বেশির ভাগ নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং বিষয়টি লিখিতভাবে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠান। বিষয়টি আমলে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আশরাফ সরকারকে বাদ দিয়ে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চুকে নৌকার টিকিট দেন। কেন্দ্র থেকে আশরাফ সরকারের মনোনয়ন বাতিল করায় হীরুর সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নৌকার প্রার্থীর ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন চারজন। এর মধ্যে একজনের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় অন্য তিন প্রার্থী ভোটের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ধানের শীষের প্রার্থী হারুন অর রশীদ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মৃত সামসুউদ্দিন আহমেদ এছাকের ছেলে। বিএনপির মধ্যে বর্তমানে খুব বেশি কোন্দল নেই। পাশাপাশি নৌকার প্রার্থীর ভোট কাটতে তিন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকার সুবিধা তিনি পাবেন। এতে তিনি সহজে বিজয়ী হবেন বলে মনে করছে বিএনপি।

হতাশ আওয়ামী নেতাকর্মীরা বলছেন, যেখানে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে বলেছেন, যাঁরা বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন আর তাঁদের যাঁরা মদদ কিংবা প্রশ্রয় দেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সাহস কোথায় পান তাঁরা?

নৌকার প্রার্থী আমজাদ হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘নৌকাকে পরাজিত করতে নয়, আমাদের নেত্রীকে পরাজিত করতে ওরা মাঠে ষড়যন্ত্র করছে। আমার নেত্রী আমাকে নৌকা দিয়েছেন। সেই নৌকার বিরুদ্ধে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে নেমেছেন।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এমপি হীরুর ঘনিষ্ঠরা নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করতেই মাঠে। আর এই সুযোগ নেবেন বিএনপির প্রার্থী।’ জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান শামীম নেওয়াজ বলেন, ‘নরসিংদী পৌর নির্বাচনে যাঁরা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাঁরা সবাই স্থানীয় সাংসদ হীরু সাহেবের আশীর্বাদপুষ্ট। উনার প্ররোচনায়ই তাঁরা প্রার্থী হয়েছেন। সম্প্রতি উনি নিজে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করতে নানা ফন্দি আঁটছেন, যার বাস্তব প্রমাণ বিএনপির প্রার্থীও তাঁর নাতি। কোনো কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হলে বিএনপির প্রার্থীকে মৌন সমর্থন দিয়ে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করতে তিনি চেষ্টা করবেন।’

শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘আমি দুবার মেয়র ছিলাম নরসিংদীতে। কিন্তু আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি দল থেকে, দেওয়া হয়েছে আমজাদ হোসেন বাচ্চু ভাইকে। আর নেত্রীর মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করতেই আমরা কাজ করছি। নেত্রীর নির্দেশের বাইরে কখনো যাইনি, আগামীতেও যাব না। কিন্তু নেত্রীর প্রার্থীকে পরাজিত করতে তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী এখন মাঠে নেমেছে। এরা কারা সেটা নরসিংদীবাসী জানে।’

জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জি এম তালেব হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মানে জননেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে অমান্য করা। যারা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে তাদের বিরুদ্ধে দল থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা