kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের প্রতিবেদন

চাল, আলু ও পেঁয়াজের দাম বাড়ায় তৃতীয় পক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাল, আলু ও পেঁয়াজের দাম বাড়ায় তৃতীয় পক্ষ

বাজারে চাল, আলু ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে সরবরাহ সংকট নয়, বরং তৃতীয় পক্ষের হাত রয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে। উৎপাদক, খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তার মাঝে এই তৃতীয় পক্ষ বলতে মধ্যস্বত্বভোগী, বিশেষ করে মিলার, আড়তদার ও পাইকারদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও বড় ব্যবসায়ীদের আধিপত্যকেও এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়েছে।

তবে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে উৎপাদন ঘাটতিও দাম বৃদ্ধির কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে ১১টি, আলুর দাম বৃদ্ধির পেছনে ১২টি ও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পেছনে ছয়টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার স্থিতিশীলতায় প্রতিটির ক্ষেত্রেই ছয় থেকে আটটি সুপারিশ করা হয়েছে। 

রাষ্ট্রীয় গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) গত ডিসেম্বরে গবেষণাটি করে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিএআরসির মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে চাল, আলু ও পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণ উদঘাটন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষিসচিব মো.  মেসবাহুল ইসলাম। বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ারের সভাপতিত্বে ইউজিভির উপাচার্য ও গবেষকদলের সমন্বয়ক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সব কৃষকই ধান কাটার প্রথম মাসের মধ্যে বাজারজাতযোগ্য উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ বিক্রি করে দেন। কিন্তু গত বোরো মৌসুমে ধান বিক্রির ধরনটি পরিবর্তিত হয়েছে। এই মৌসুমে কৃষকরা তাঁদের ধান মজুদ থেকে ধীরে ধীরে বিক্রি করেছেন। সরকারের কম চাল সংগ্রহ ও যথাসময়ে আমদানির ব্যর্থতা এবং প্রয়োজনীয় বাজার হস্তক্ষেপের অভাব মূল্যবৃদ্ধির কারণ ছিল।

ধানের বাজারে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বড় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ও অসম প্রতিযোগিতা; আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কা; ধান চাষের ব্যয় ও প্রক্রিয়াকরণের খরচ বৃদ্ধি; ক্রমবর্ধমান মৌসুমি ব্যবসায়ী বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন হ্রাস।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং সরকারি খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় মিল মালিক ও পাইকাররা সুযোগ নিয়েছে, বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে যাতে না হয় সে জন্য আগামী বোরো মৌসুমে ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’

আলুর দাম বাড়ার পেছনে ছিল ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধির আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আলুর মজুদ এবং হিমাগার থেকে আলুর কম সরবরাহ; হিমাগারে মজুদকৃত আলুর পুনঃপুনঃ হস্তান্তর; পাশের কয়েকটি দেশে আলু রপ্তানি; মৌসুমি ব্যবসায়ীদের আলুর বিপুল মজুদ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি; বর্ষা মৌসুমের ব্যাপ্তি দীর্ঘতর হওয়ায় সবজির উৎপাদন হ্রাস এবং আলুর চাহিদা বৃদ্ধি; হিমাগারে আলু সংরক্ষণের পরিমাণ কম; টিসিবির আলুর বিতরণে অপ্রতুলতা প্রভৃতি কারণ।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে কারণ ছিল দেশীয় অসাধু বাণিজ্য সিন্ডিকেট দ্বারা বাজারে কারসাজি; ভারতীয় রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা অথবা অতিমাত্রায় ভারতের ওপর পেঁয়াজ আমদানির জন্য নির্ভরতা; আমদানির জন্য পেঁয়াজের বিকল্প উৎসর সন্ধানে দ্রুত কার্যক্রমের অভাব এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও মুড়িকাটা পেঁয়াজের সীমিত উৎপাদন।

ধান-চাল নিয়ে সুপারিশ

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ধান-চাল সংগ্রহ পদ্ধতির আধুনিকায়ন করা, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরিভাবে ধান সংগ্রহ করা এবং মিলারদের মাধ্যমে তা চালে পরিণত করা; চিকন ও মোটা দানার চালের জন্য সরকারের পৃথক ন্যূনতম সহায়তা মূল্য (এসএমপি) ঘোষণা করা; ন্যূনতম ২৫ লাখ টন চাল সংগ্রহ করা এবং মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সংগ্রহ করার সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে করে সরকার বাজারে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে; বাফার স্টক হিসেবে সরকার কর্তৃক প্রতি মাসে কমপক্ষে ১২.৫০ লাখ টন চাল মজুদ নিশ্চিত করা; উৎপাদন ব্যয়ের ওপর কমপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনা করে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা।

আলু নিয়ে সুপারিশ

কৃষি মূল্য কমিশন স্থাপন এবং পরে সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন সাপোর্ট মূল্যের ঘোষণা প্রদান; উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ ও দামের তথ্যাবলিতে অস্পষ্টতা অপসারণ; হিমাগারে আলুর সংরক্ষণ ও অবমুক্তকরণ সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মধ্যে রাখা; আলুর বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের শনাক্তকরণ এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা; আলু ও আলুর তৈরি বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা; বিদেশে চাহিদাকৃত আলুর জাতের উন্নয়ন এবং যেসব আলু প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত হয়, সেসব আলুর জাত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।

পেঁয়াজ নিয়ে সুপারিশ

অসাধু বাণিজ্য সিন্ডিকেট শনাক্তকরণ করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা; সংকটকালে পেঁয়াজ আমদানির জন্য দ্রুত একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সন্ধান করা; অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করা; কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের মাধ্যমে সারা বছর বাজারে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ ও তদারক করা; বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও মজুদের অগ্রিম ব্যবস্থাপনা করা।

মন্তব্য