kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

ব্যাংক আমানত, শেয়ারবাজার ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি চাঙ্গা

প্রণোদনার টাকাও কি সরানো হচ্ছে, অনুসন্ধানের পরামর্শ

জিয়াদুল ইসলাম   

২৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রণোদনার টাকাও কি সরানো হচ্ছে, অনুসন্ধানের পরামর্শ

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়া, কাজ হারানোর দরুন বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালানোর তথ্য উঠে আসে বিভিন্ন সংস্থার জারিপে। এতে ব্যাংকে আমানত রাখা ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কথা। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে সেই প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও কয়েক মাস ধরে ব্যাংকে আমানত ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি হু হু করে বাড়ছে। শেয়ারবাজারও চাঙ্গা।

করোনাকালে মানুষের আয় কমার পরও এই তিন খাতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশিমাত্রায় বিনিয়োগ হওয়ার বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই মনে করছেন, করোনার ক্ষতি পোষাতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা ঋণের টাকার একটা অংশ সরিয়ে এসব জায়গায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে খোঁজখবর রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন কিছু কর্মকর্তারও ধারণা এ রকম। কারণ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সহায়ক বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে মন্দাবস্থা চলছে।

এমন অবস্থায় এসব খাতে বিনিয়োগ করা টাকার প্রকৃত উৎস কী তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দেখা গেছে, এক উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়ে অন্য উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হয়েছে। পরে সেই ঋণ আর ফেরত আসেনি। প্রণোদনার ঋণও যথাযথ উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হলে তা সঠিক সময়ে ফেরত আসবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাকালে শেয়ারবাজারের উত্থান, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির সাম্প্রতিক যে গতিধারা তাতে ধারণা করা যায়, প্রণোদনার টাকার একটা অংশও এসব জায়গায় বিনিয়োগ হিসেবে আসছে। প্রকৃতপক্ষে প্রণোদনার সুবিধাভোগীদের কেউ এ রকম করছে কি না বা করেও যদি থাকে সেটা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন

(বিএসইসি) ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেদের উদ্যোগেই বের করতে পারে। কারণ বিএসইসির কাছে শেয়ারবাজারের প্রতিটি লেনদনের তথ্য রেকর্ড থাকে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো যেসব ব্যবসায়ীকে প্রণোদনার ঋণ দিয়েছে, সেটারও রেকর্ড রয়েছে। ব্যবসায়ীরা ওই ঋণের টাকা যথাযথ কাজে খাটাল কি না সেটা ব্যাংকগুলো তদারকির মাধ্যমে বের করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ খুব দ্রুতই বিতরণ করা হয়েছে। আমার ধারণা, সেই প্রণোদনার টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়নি। এর পরিবর্তে শেয়ারবাজারে টাকা চলে গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি এফডিআরে টাকা খাটানো হতে পারে।’ এটা খতিয়ে দেখা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

অবশ্য ড. সালেহউদ্দিন আরো বলেন, করোনার সময় যাঁদের ব্যবসা ভালো হয়েছে, তাঁরা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন। এসব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর টাকাও শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকে আমানত হিসেবে ঢুকতে পারে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ের একটা অংশও এ তিন খাতে আসছে। অনেকেই কালো টাকা সাদা করেছেন। শেয়ারবাজারেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গত মার্চ থেকে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর স্থবির হতে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের চাকা ছিল প্রায় বন্ধ। এ সময় বেসরকারি বিনিয়োগ আরো নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। সাধারণ ছুটি তুলে নেওয়ার পর থেকে ক্রমেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করছেন সবাই। তবে কয়েক মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়েনি। ঋণ যেটুকু বেড়েছে, তা মূলত প্রণোদনানির্ভর। সরকার এখন পর্যন্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা ঘোষণা করেছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিকে বলা হচ্ছে আয় কমে যাচ্ছে, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ, ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধি ও শেয়ারবাজার চাঙ্গা রয়েছে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক। প্রণোদনার ঋণের টাকাও ডাইভার্ট হতে পারে। তবে বিস্তারিত অনুসন্ধান ছাড়া এটা বলা মুশকিল যে টাকার উৎস বা সূত্রটা কোথায়।’ তিনি বলেন, প্রকৃত উৎপাদন সহায়ক খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমে গেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও কমছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, করোনার ৯ মাসে সোয়া এক লাখ কোটি টাকার মতো আমানত বেড়েছে। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকিং খাতে আমাতের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। সংক্রমণ শনাক্তের পরের মাস মার্চে সেই আমানত নেমে আসে ১১ লাখ ৩৬ হাজার ৪১৪ কোটি টাকায়। এরপর থেকে একক মাসের হিসাবে আমানত আর না কমলেও মে পর্যন্ত বাড়ার গতি ছিল খুবই ধীর। তবে জুনের পর থেকে তা হু হু করে বাড়ছে এবং নভেম্বরে বার্ষিক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১৩.২৭ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ জুন থেকে নভেম্বর এই ছয় মাসে ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। আর মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আমানত বেড়েছে এক লাখ ২৪ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। অথচ স্বাভাবিক বছর ২০১৯ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আমানত বেড়েছিল এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনায় বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা বিরাজ করছে। আর বিনিয়োগ না হওয়া মানে সেই টাকা ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হচ্ছে। আবার করোনার কারণে খরচ কমিয়েও ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঞ্চয় করছে অনেকে। এ ছাড়া করোনার মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। ওই রেমিট্যান্সের একটা অংশ আমানত হিসেবেও ব্যাংকে ঢুকেছে।

প্রণোদনার টাকা সরিয়ে সঞ্চয় করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের এমডি মো. আতাউর রহমান প্রধান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘না, এমনটি আমার মনে হচ্ছে না। কারণ সুবিধাভোগীরা প্রণোদনার টাকা নিয়ে থেমে গেছেন তা নয় কিন্তু। ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করার চেষ্টা করেছেন। তবে এটাও ঠিক, ঋণের যে কিস্তিগুলো শোধ করার কথা ছিল, করোনার কারণে সেটা শোধে ছাড় দেওয়ায় অনেকেই ওই টাকাটা জমিয়ে রেখেছে, এইটুকু হতে পারে।’

জাতীর সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন কড়াকড়ি আরোপ ও করোনার কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে মাত্র ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অর্থবছরের মাত্র পাঁচ মাসেই নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৯ হাজার ৪৫ কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৫ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মাত্র পাঁচ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ। এক মাস ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রতিদিন এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতে দেখা যাচ্ছে। ২০১০ সালের পর এমনটি আর দেখা যায়নি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের মাধ্যমে যখন যেটা বাস্তবায়ন করা হয়, সেটা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলো কি না সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও খতিয়ে দেখা হয়। আবার সুনির্দিস্ট অভিযোগ, আশঙ্কা বা সন্দেহ থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ পরিদর্শন করা হয়। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে বা এ রকম কোনো সন্দেহ হলে অবশ্যই আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা