kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

বিদ্রোহী প্যাঁচে আওয়ামী লীগ পরিবেশ শঙ্কায় বিএনপি

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিদ্রোহী প্যাঁচে আওয়ামী লীগ পরিবেশ শঙ্কায় বিএনপি

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে নগরজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণা। মেয়র পদে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতিতে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ ছয়টি রাজনৈতিক দল এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থী ঘিরেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সব মহলে আলোচনা চলছে।

আগামী বুধবার নির্বাচন। মূলত নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে ভোটযুদ্ধ শুরুর আগে জয়-পরাজয় ও ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে উভয় দলেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উদ্বেগ ও শঙ্কা বেশির ভাগ ওয়ার্ডে তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে। দল মনোনীত মেয়র ও সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও ৩৯টির মধ্যে ৩২টি সাধারণ ওয়ার্ডে এবং ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টিতে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয়। তাঁদের অনেকেই নির্বাচনী মাঠ নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধীরা নানা কৌশলে কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। বিদ্রোহীদের কারণে দল সমর্থিত কাউন্সিলরের পাশাপাশি মেয়র প্রার্থীর ভোটেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার বড় আশঙ্কা করছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, বিদ্রোহীদের নিয়ে নানা শঙ্কার ব্যাপারে এরই মধ্যে তাঁরা দলের হাইকমান্ড ও প্রশাসনকে অবহিত করেছেন। সুষ্ঠু ভোট হলে বর্তমান সরকারের আমলে উন্নয়নের কারণে ভোটাররা নৌকাসহ দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদেরই ভোট দেবেন। ভোটাররাই বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করবেন।

আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রে ঢুকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। জনগণ উন্নয়নের পক্ষে নৌকায় ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতেই নৌকার বিকল্প নেই। বিএনপি-জামায়াত যতই যড়যন্ত্র করুক না কেন, এসব ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি।’ 

আওয়ামী লীগের চসিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘আমরা দল মনোনীত মেয়র ও সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছি। উন্নয়নের সুফল আমরা পাব। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য ভোটাররা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মানিত ভোটাররা নৌকায় ভোট দিয়ে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবেন বলে আমার বিশ্বাস।’

বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে দলে আশঙ্কার বিষয়ে সাবেক এই মেয়র বলেন, ‘এখনো সময় আছে দল সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে যাঁরা (বিদ্রোহী) নির্বাচনী মাঠে আছেন, তাঁদের শেষবারের মতো বলছি, দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করুন, তা না হলে দল কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

নগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হাসান মো. শমসের বলেন, ‘বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী কেন্দ্রে ঢুকে আমাদের মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা করছি। বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছি।’ তিনি জানান, ৩৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩২টিতে ৫৮ জন এবং ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টিতে ২৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচটি সাধারণ ওয়ার্ডে পাঁচজন নগর আওয়ামী লীগ বরাবরে চিঠি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন মাত্র একটি সাধারণ ও দুটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে। অপর ওয়ার্ডগুলোতে তাদের একক প্রার্থী থাকলেও দলের নেতারা চিন্তিত ভোটের দিন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকা নিয়ে। নেতারা বলেছেন, ভোটের দিন যতই সামনে আসছে, ততই পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শঙ্কা ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না। তাঁদের অভিযোগ, মামলা-মোকদ্দমা কাঁধে নিয়ে মেয়র থেকে শুরু করে বেশির ভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচন করছেন। আর এরই মধ্যে তাঁদের নির্বাচনী এজেন্ট থেকে শুরু করে নেতাকর্মীদের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি হুমকি-ধমকিসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। একের পর এক মামলা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিএনপি নেতাদের আশাবাদ সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ ভোট হলে ধানের শীষ বিজয়ী হবে। 

জানতে চাইলে বিএনপির ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্ত ছাড়াই গায়েবি মামলা দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি উৎসাহী ব্যক্তিদের দিয়ে হয়রানি ও ঘরে ঘরে গিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা ভোটারদের কেন্দ্রে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। ভোটাররা যাতে কেন্দ্রে গিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে ধানের শীষকে জেতাতে ভোটাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটকেন্দ্রে আসবেন।’ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা কেন্দ্রে ঢুকবেন বলে আওয়ামী লীগের আশঙ্কার ব্যাপারে বিএনপির মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘তাদের বিদ্রোহীদের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই।’ 

বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান গতকাল বিকেলে বলেন, ‘সাধারণ ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা আছে, তাঁরা কেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না। আবার কেন্দ্রে গেলে ব্যালট প্যানেল সুরক্ষা থাকবে কি না অর্থাৎ নিজের পছন্দমতো প্রতীকে ভোট দিলে তাতে কেউ প্রভাব বিস্তার করবে কি না, প্রার্থী যথাযথভাবে ভোট পাবেন কি না—এসব শঙ্কায় আছি আমরা। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি বেড়ে গেছে। ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’ 

নগরের ৪ নম্বর চান্দগাঁও সাধারণ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী, সাবেক কাউন্সিলর মো. সাইফুদ্দিন খালেদ অভিযোগ করেন, ‘আমার ওয়ার্ডে দলের পাঁচজন বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। এখানে বিএনপির একক প্রার্থী। আমি বিএনপির প্রার্থীর জন্য চিন্তা করছি না। বিদ্রোহী প্রার্থীদের লোকজন এরই মধ্যে কেন্দ্র কমিটিগুলোতে ঢুকে গেছেন। আমি অভিযোগ দিয়েছি দলীয় নেতাদের কাছে। আমাদের আশঙ্কা, বিদ্রোহী প্রার্থীর মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা কেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষে ভোট দিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। তাঁরা গোপন বৈঠক করছেন বলেও এলাকায় আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ ঠেকাতে বিদ্রোহীরা মাঠে নেমেছেন।’ ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও আমাদের দলের দুজন বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে গোপন বৈঠক হয়েছে। আমাকে এবং আমাদের মেয়র প্রার্থীকে ঠেকাতে তাঁরা চেষ্টা করছেন। বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দিতে ষড়যন্ত্র করছেন। এ কারণে আমাদের আশঙ্কা ভোটে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে সরকারবিরোধীরা কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।’ 

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থীর পাশাপাশি আরো পাঁচজন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সাধারণ ওয়ার্ডের ৪০টিতে ১৭৩ জন এবং সংরক্ষিত ১৪টি ওয়ার্ডে ৫৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ডে ৬৩ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ২৮ জন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। অন্যদিকে একটি সাধারণ এবং দুটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিএনপির পাঁচজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা