kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

উড়োজাহাজ ওঠানামায় এখনো সনাতন পদ্ধতি

ঘন কুয়াশায় ফ্লাইট বিপর্যয়

মাসুদ রুমী   

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




উড়োজাহাজ ওঠানামায় এখনো সনাতন পদ্ধতি

মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষপণ করেছে বাংলাদেশ। চলছে আরো একটি স্যাটেলাইট তৈরির প্রস্তুতি। এই সামর্থ্যে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ উঠে এলেও দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরগুলো প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উত্তরোত্তর আধুনিক হয়ে উঠলেও ব্যতিক্রম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের অন্য অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোও চলছে মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে। একটু কুয়াশা হলেই বন্ধ হয়ে যায় উড়োজাহাজ ওঠানামা। ঢাকার ফ্লাইট নামে সিলেটে, সিলেটের ফ্লাইট নামে চট্টগ্রামে। সব কিছু হয়ে যায় হ-য-ব-র-ল।

প্রতিবছরই শীত মৌসুমে বিমানবন্দরে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় যাত্রীদের। বিমানবন্দরগুলোর ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম বা আইএলএস উন্নত না হওয়ায় ঘন কুয়াশায় বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেশের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট ওঠানামায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আরো বছরখানেক লাগতে পারে বলে জানাচ্ছেন কর্তাব্যক্তিরা।

জানা গেছে, সাধারণ দৃষ্টিসীমা (ভিজিবিলিটি) ৬০০ থেকে ৮০০ মিটার থাকলে উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। তবে গতকাল বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকার দৃষ্টিসীমা ১০০ মিটার থেকে শূন্যে নেমে আসে। ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে না পেরে চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। শুক্রবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে আসা ইউএস-বাংলার ফ্লাইটটি ঢাকায় নামতে না পেরে চট্টগ্রামে চলে আসে।

এরপর সকাল সোয়া ৯টার দিকে ওমান থেকে আসা ইউএস-বাংলার অন্য ফ্লাইটটিও চট্টগ্রামে চলে আসে। এ ছাড়া জেদ্দা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অন্য একটি ফ্লাইট ঢাকায় নামতে না পেরে সিলেটে অবতরণ করে। ওই ফ্লাইটে আসা যাত্রীসহ ফিরতি ফ্লাইটের বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছে। একই কারণে বিমান, নভো এয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ রুটের সকালের সব ফ্লাইট নির্দিষ্ট সময়ের এক থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ঢাকা ছাড়ে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, কুয়াশার কারণে ভোরে শাহ?জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। ভোর ৫টা থেকে অন্তত ছয় ঘণ্টা এই বিমানবন্দর থেকে কোনো বিমান ছেড়ে যায় না, নামেও না। অথচ ভোরে বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এসে ঢাকায় নামে, যেগুলোতে থাকে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ঢাকার উদ্দেশে আসা যাত্রীরা।

ঘন কুয়াশায় গতকাল শুক্রবার বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছাড়াও কক্সবাজার, সৈয়দপুর, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও যশোরে প্রায়ই ফ্লাইট ওঠানামায় বিঘ্ন ঘটছে।

সৈয়দপুর থেকে ঢাকায় আসা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের যাত্রী শায়লা বানু কালের কণ্ঠকে জানান, ঢাকায় তাঁর একটি জরুরি মিটিং ছিল। ফ্লাইট দেরি হওয়ায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। তাঁর মতো সৈয়দপুর বিমানবন্দরের টার্মিনালে প্রায় সাড়ে ৫০০ যাত্রী বিড়ম্বনায় পড়ে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের স্টেশন এয়ার ট্রাফিক অফিসার মোহাম্মদ দৌলতুজ্জামান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘন কুয়াশার কারণে গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরের দৃষ্টিসীমা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছিল। এই কারণে রাতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি ফ্লাইট চট্টগ্রাম এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট সিলেটে ডাইভার্ট করতে হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি উড়োজাহাজের সময়মতো শাহজালালে নামতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।’

দৌলতুজ্জামান বলেন, ‘শাহজালালে ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম আছে; কিন্তু সেটি আইএলএস ক্যাটাগরি-১। আমাদের ক্যাটাগরি-২-এ যাওয়ার কার্যক্রম চলমান আছে। এটি আগামী বছর নাগাদ শেষ হলে আরেকটু কম ভিজিবিলিটিতেও উড়োজাহাজ অবতরণ করতে পারবে। শাহজালালে অবতরণে ন্যূনতম ৮০০ মিটার এবং রানওয়ে ভিজিবিলিটি রেঞ্জ (আরবিআর) ৬০০ মিটার প্রয়োজন হয়। তিনি জানান, রানওয়ে সেন্ট্রাল লাইট আগে ছিল, এখন বন্ধ আছে। আমাদের স্ট্যান্ডবাই পাওয়ার সাপ্লাইতেও সমস্যা আছে। এখন ক্যাটাগরি-১-এর শর্ত অনুযায়ী ১৫ মিনিটের মধ্যে পাওয়ার সাপ্লাই এলেই হয়। কিন্তু ক্যাটাগরি-২ উত্তরণের জন্য মাত্র তিন সেকেন্ডে তা আসতে হবে। এই সমস্যাটি আমাদের এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শিকদার মেজবাহউদ্দীন আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘন কুয়াশার কারণে হযরত শাহজালালে বিমান অবতরণে সমস্যা। আকাশ থেকে কুয়াশার কারণে রানওয়ে দেখা যায় না। কুয়াশার কারণে ইনস্ট্রুমেন্টের সাহায্যে অবতরণ করতে হয়। এটার জন্য বিমানবন্দরে অনেক সুবিধার প্রয়োজন হয়। যার মধ্যে রয়েভে ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) এবং আরনার ল্যান্ডিং সিস্টেম। বাংলাদেশে আগে যে প্রচলিত ভিওআর অ্যাপ্রোচ ছিল সেই অ্যাপ্রোচগুলো তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়া অন্যগুলোতে সেই পুরনো সিস্টেম আছে। কুয়াশার কারণে ফ্লাইট এভাবেই ডিলে হয় এবং আমাদের সময়মতো যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বেগ পেতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, বিদেশের প্রায় সব বিমানবন্দরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে, আমাদের দেশেও এটির উন্নয়নের কাজ চলছে। আশা করি এটি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।’

জানতে চাইলে শাহ?জালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ উল-আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুয়াশা প্রাকৃতিক বিষয়, এটা রোধ করা যাবে না। কুয়াশার কারণে ভোর থেকে ভিজিবিলিটি শূন্য হওয়ায় বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়। কুয়াশা মোকাবেলায় আমরা লাইটিং সিস্টেম উন্নত করার কাজ করছি। আমাদের ক্যাটাগরি-২-তে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, এ জন্য যেসব ইনস্ট্রুমেন্ট ও প্রযুক্তি প্রয়োজন তার চাহিদা দেওয়া হয়েছে। এগুলো এলে পাইলটরা অল্প ভিজিবিলিটির মধ্যেও শাহজালালে অবতরণ করতে পারবেন।’

তিনি বলেন, কুয়াশার কারণে আরো নানা সমস্যা হচ্ছে। যাত্রীরা বহির্গমনের জন্য বিমানবন্দরে চলে আসছে। যেহেতু ফ্লাইট ছাড়ছে না, এয়ারপোর্টে প্রচুর ভিড় হচ্ছে। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে। আবার যখন ভিজিবিলিটি আসছে, তখন যেখানে দুটি ফ্লাইট আসার কথা ছিল সেখানে ১০টি ফ্লাইট চলে আসছে। তখন সীমিত বোর্ডিং ব্রিজ, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে সীমিত জায়গায় ফ্লাইট ও যাত্রীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখনকার অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে তাদের কোথাও বসতে দেওয়ার জায়গাও থাকে না।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, রাডারসহ অত্যাধুনিক অটোমেটেড এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন করা হচ্ছে বিমানবন্দরে। এরই মধ্যে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে ফ্রান্সের সঙ্গে আর্থিক প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে। ফ্রান্সের থ্যালাস টেকনোলজি একটি আধুনিক রাডারসহ ২০ ধরনের যন্ত্রপাতি এবং সফটওয়্যার সলিউশনসহ একটি আধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন করবে। এটি হলে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ফ্লাইট পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা