kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

নারী কাজি হওয়া প্রসঙ্গে বিশিষ্টজনরা

লড়াইটা আয়েশার একার না

ফাতিমা তুজ জোহরা   

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লড়াইটা আয়েশার একার না

দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়া পৌরসভার মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা। তিনি দেশের প্রথম নারী কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারী হওয়ায় এই পদে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর হাইকোর্টও সামাজিক ও বাস্তব প্ররিপ্রেক্ষিত বিবেচনার কারণ দেখিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অবস্থানকে সমর্থন করে রায় দেন।

তবে আয়েশা দমে যাবেন না, লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সমাজের বিশিষ্টজনদের অনেকেই তাঁর এই অবস্থানকে সমর্থন ও উৎসাহ জানিয়ে বলেছেন, আয়েশার এ লড়াইটা একার না, এটা সমাজের সবার লড়াই। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে নারীকে তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে দিতে হবে। নারীর কাজি হওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে সঠিক রায় আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

নারীর যোগ্যতা প্রধান বিবেচ্য বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের যে সামাজিক কুসংস্কারগুলো আছে সেগুলো ভাঙা উচিত। পবিত্র-অপবিত্রতার বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই নিয়ে আসা উচিত নয়। নারীর যোগ্যতা প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। সেখানে যে আলোচনাকে কারণ হিসেবে দেখানো

হচ্ছে সেটা খুব অসম্মানজনক। এ ধরনের পশ্চাৎপদ চিন্তার অবস্থান থেকে আমাদের সরে আসা উচিত। আমাদের বাধাধরা অবস্থান থেকে সরে আসা উচিত। নারীদের পিছিয়ে রাখার জন্য এসব বিশ্বাসের জায়গা অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।’

দেশের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইনগতভাবে নারীদের নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে কোনো বাধা নেই। যে বাধার কথা বলা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা। পাইলট, সৈনিক, পুলিশ—কোথায় নেই মেয়েরা। সেখানে মেয়েরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবে না বলে রায় দেওয়া হলো। অপ্রাসঙ্গিক একটি কারণ দেখানো হয়েছে। অদ্ভুত কিছু যুক্তি দেখানো হয়েছে। একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার বিয়ে পড়াবেন এমন বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি শুধু রেজিস্ট্রি করবেন। আমি আশা করি সুপ্রিম কোর্ট থেকে সঠিক রায় দেবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি যখন প্রথম বিচারক হয়েছিলাম তখন পারিপার্শ্বিক মনোভব অনুকূল ছিল। সামাজিকভাবে কিছু স্থানে অনাস্থা ছিল। মেয়েরা আবার কী বিচার করবে, এমন কথাও বলেছেন অনেকে। খুব তাড়াতাড়ি আবার মানুষের ভুল ভেঙেছে। আয়েশার বেলায়ও তাই হবে।’

অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘নারীরা যখন আত্মনির্ভরশীল হয় তখন পুরুষের তৈরি কাঠামোগুলোর ওপর নারীর নির্ভরতা কমে যায়। এর বিরুদ্ধে তখন নানা অজুহাত তোলা হয়। রক্ষণশীলতার অজুহাতে একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায়। আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশ এগিয়ে গেছে। কিন্তু এই উপমহাদেশের কয়েকটি দেশে নারীর প্রতি এক ধরনের অবরোধ তৈরি করে রাখা হয়েছে। আয়েশারা যখন রুখে দাঁড়াবে সমাজ তখন পিছু হটতে বাধ্য হবে। একটি মেয়ে যখন চাকরি পায় তখন তার প্রধান বিনিয়োগের জায়গা হয় সন্তানের লেখাপড়া। এ জন্য শুরু থেকে নারীর প্রতি সমর্থন দেওয়া উচিত। এত বেশি রক্ষণশীলতার কথা বলছে আবার মেয়েরা পাইলটও হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এমন কোনো পেশা নেই, যেখানে মেয়েরা নেই। নরওয়ে-সুইডেন এসব দেশে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। সমাজও অনেক গতিশীল। আয়েশার মতো মেয়েদের সর্বাত্মক সহায়তা করা আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। উন্নয়ন ও সমাজের গতিশীলতা ধরে রাখতে হলে সকল ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ জরুরি। আমি চাই আয়েশা একটি উদাহরণ সৃষ্টি করে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এখানে সমাজের দায় আছে। মেয়েরা শিক্ষিত-কর্মক্ষম না হলে সমাজ এগোবে না।’

জানতে চাইলে আয়েশা সিদ্দিকা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই লড়াইয়ে আমিই প্রথম। এ জন্য অনেক মত-দ্বিমত থাকবে। তবে কাউকে না কাউকে তো শুরু করতে হবে। এ জন্য মনোবল হারাচ্ছি না। আর পরিবার আমার সঙ্গে আছে। আমার সাহসের জায়গা সেটি।’

উচ্চ আদালত পুনর্বিবেচনা করে সঠিক রায় দেবেন—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমার সিদ্ধান্তে আমি এখনো অটল। ঘাত-প্রতিঘাত থাকবে। তবে আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। সব জায়গা থেকে আমি সহযোগিতা পাচ্ছি। এটি আমার শক্তি আর সাহসের জায়গা।’

আয়েশা বলেন, ‘নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কোথাও ছিল না যে শুধু পুরুষ সদস্যরা আবেদন করতে পারবে। লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে আমি উত্তীর্ণ হয়েছি। এমনকি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গঠিত কমিটিও প্যানেল প্রস্তাব দিয়ে চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় জানিয়ে নিয়োগ কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বাতিল করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আবেদনপত্র বাছাই পরীক্ষার সময় আমাকে অযোগ্য জানিয়ে বাদ দেওয়া হয়নি। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় থেকে যে কারণ দেখিয়ে অযোগ্য বলা হয়েছে, এটা আমার জন্য প্রত্যাশিত ছিল না। শুধু নারী এই কারণ দেখিয়ে যোগ্যতার বিচার হতে পারে না।’

আয়েশার এই লড়াইয়ের সূত্রপাত ২০১৪ সালে ফুলবাড়িয়া পৌরসভার কাজী হিসেবে নিয়োগের জন্য তিন নারীর নাম প্রস্তাব আসার পর। ওই প্যানেলের প্রথমেই ছিল আয়েশার নাম। ‘দেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’ মত দিয়ে ওই প্রস্তাব বাতিল করে আইন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন আয়েশা। গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রায়ে হাইকোর্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংক্ষুব্ধ পক্ষ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা