kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

সাকিবের দুর্ধর্ষ ‘নিজস্ব টিম’

এস এম আজাদ   

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাকিবের দুর্ধর্ষ ‘নিজস্ব টিম’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার জন্য একজন উপপরিচালকের (ডিডি) পদ তৈরি হলেও কর্মকর্তাস্বল্পতায় সেখানে ওই পদের কর্মকর্তা দেওয়া হয়নি। ফলে জেলার প্রধান হিসেবেই নিজের ইচ্ছামতো দায়িত্ব পালন ও বণ্টন করছিলেন সহকারী পরিচালক (এডি) এস এম সাকিব হোসেন ওরফে সাকিব শিকদার। এই সুযোগে ঢাকায় এসে সোনা ছিনতাইয়ের জন্য নিজস্ব একটি টিম গড়ে তোলেন তিনি! জেলা অফিসে ১০-১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করলেও বিশ্বস্ত চারজনকে গাড়িতে নিয়ে পুরান ঢাকায় এসে ওত পাততেন সাকিব। তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগীরা হলেন—এএসআই মো. এমদাদুল, সিপাহি আমিনুল ইসলাম, আলমগীর হোসেন ও গাড়িচালক ইব্রাহিম শিকদার। আর পুরান ঢাকা থেকে বেশি পরিমাণে সোনা বহনকারীদের তথ্য তাঁকে ফোনে জানাত সোনার দোকানের কর্মী জীবন পাল। দুই বছর আগে মুন্সীগঞ্জে এডি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই অপকর্ম শুরু করেন সাকিব, যা অফিসের অন্য সহকর্মীরা টেরই পাননি। ছয়-সাত মাস আগে অধিদপ্তর থেকে জেলা অফিসের পিকআপ গাড়ি পাওয়ার পর নিজস্ব টিম নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। পিকআপ পাওয়ার আগে ভাড়া গাড়িতেও নিজস্ব টিম নিয়ে অপকর্ম করতেন তিনি।

গত ৭ জানুয়ারি পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীর ৯০ ভরি সোনা লুটের ঘটনায় সাকিবসহ ডিএনসির পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের তিন সহযোগী গ্রেপ্তারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার সাকিবের ঘনিষ্ঠ গাড়িচালক ইব্রাহিম এবং সোমবার সহযোগী জীবন পাল ও রতন কুমার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সাকিবসহ পাঁচজনকে আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। সাকিব ও তাঁর সহযোগীদের অপকর্মে বিব্রত ডিএনসি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গতকাল পাঁচজনকেই সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত ও বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে কঠোর শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং দুই সহযোগীর জবানবন্দিতে সাকিবসহ কর্মীদের জড়িত থাকার তথ্য মেলায় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাঁদের গ্রেপ্তারে সহায়তা করেছে ডিএনসি কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসায়ী সিদ্দিকুরের করা মামলার তদন্ত চলছে। সরকারি একটি সংস্থার কর্মীদের অপরাধ পুরোপুরি প্রমাণ না হওয়ার আগে আমরা কথা বলতে পারি না। আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনজন জবাবন্দি দিয়েছেন। চারজন রিমান্ডে আছেন।’

গতকাল ডিএনসির কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাকিব ও তাঁর সহযোগীদের অপকর্মে বিব্রত গোটা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তথ্য দিলেও কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাঁরা বলেন, সাকিব নিজে অপরাধ করতে নিজস্ব একটি টিম গঠন করেছে। পুলিশের তদন্তে তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য বেরিয়ে আসবে। দুই আসামির জবানবন্দি এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্রে ডিএনসিকে ঘটনা জানায় পুলিশ। এরপর ডিএনসির সহায়তায়ই সাকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপর চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় ডেকে এনে পুলিশের হাতে তুলে দেয় ডিএনসি। চারজনকে অধিদপ্তরের আদেশে এবং সাকিবকে স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

গত ৭ জানুয়ারি সিদ্দিকুর রহমান নামে মুন্সীগঞ্জের এক সোনা ব্যবসায়ীর ৯০ ভরি সোনা লুটের ঘটনায় ১২ জানুয়ারি কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন তিনি। বাদীর বর্ণনা এবং জিন্দাবাহার পার্ক এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা অনুযায়ী, কয়েকজন সিদ্দিকুরকে জোর করে পিকআপভ্যানে তুলছে। তাদের পরনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো খাকি পোশাক ছিল। এরপর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, জীবন পাল নামের এক সোর্সের সঙ্গে ঘটনার দিন সন্দেহভাজন একটি নম্বরে অনেকবার কল আদান-প্রদান হয়েছে। পুলিশ জীবন পাল, রতন কুমার ও হারুন নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। সোমবার জীবন ও রতন আদালতে জবানবন্দি দেন। এর পরই সাকিবকে ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে সাকিব, কনস্টেবল আমিনুল ও সোর্স হারুনকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর গতকাল আদালতে জবাবন্দি দিয়েছেন ডিএনসির বহিষ্কৃত গাড়িচালক ইব্রাহিম। এএসআই এমদাদুল ও কনস্টেবল আলমগীরকে দুই দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরীর আদালত।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এএসআই আমিনুল ঘটনার সময় গাড়ি থেকে নামেননি বলে দাবি করেছেন। তবে তাঁর সঙ্গে সাকিবের ঘনিষ্ঠতার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের আরেক সহযোগী গাড়িচালক ইব্রাহিম। বরখাস্ত এডি সাকিব শিকদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি নড়াইলে। ৩৪তম বিসিএসের মাধ্যমে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা অনেক আগে থেকেই সোনা ছিনতাইয়ে জড়িত। জীবনের সঙ্গে অনেক পুরনো সম্পর্ক তাঁর।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা