kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

এক জানাজায় ‘রোল মডেল’ ইউএনও শুভ

বাহরাম খান   

৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক জানাজায় ‘রোল মডেল’ ইউএনও শুভ

এপ্রিলের দিকে যখন করোনা মহামারি আতঙ্কে ভীতসন্ত্রস্ত রাজধানীসহ পুরো দেশ, কেউ আক্রান্ত হলে ধারেকাছে ঘেঁষতে চাইত না স্বজনরাও, সেই সময় করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে মারা যান ঝিনাইদহের এক ব্যক্তি। লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর দাফনে পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীদের কেউ এগিয়ে আসেনি। গাড়ি থেকে মরদেহ নামানোর লোক মিলছিল না। পাওয়া যাচ্ছিল না খাটিয়াও। এমনকি জানাজা পড়াতেও রাজি হননি কোনো ইমাম। সেই পরিস্থিতিতে দাফনের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসে পুলিশ। আর মৃত ব্যক্তির জানাজায় ইমামতি করেন ঝিনাইদহ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বদরুদ্দোজা শুভ।

গত ১২ এপ্রিলের এ ঘটনাটি কালের কণ্ঠসহ উল্লেখযোগ্য গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এলে সারা দেশে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। ইউএনও শুভর সেই মানবিক উদ্যোগ প্রশাসনের লোকজনের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলে; ভয় কাটিয়ে সাহসের সঞ্চার করে প্রশাসনে ও হাজারো স্বেচ্ছাসেবকের মনে। করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজা, দাফন করালে বা আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা করলেই কেউ করোনায় যে আক্রান্ত হয়ে যান না, এই বার্তাও এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে আসে। করোনা ঝুঁকির মধ্যেও সাহসিকতার, মানবিকতার এক ‘রোল মডেল’ হয়ে ওঠেন ইউএনও শুভ। 

জানতে চাইলে বদরুদ্দোজা শুভ গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই দিন আমি জানাজা পড়াব কখনো ভাবিনি। করোনায় রোগী মারা যাওয়ার তথ্য জেনে আমি অ্যাম্বুল্যান্সের সঙ্গে কবরস্থানে যাই। গিয়ে দেখি আমাদের আগেই ডিসি স্যার সরোজ কুমার নাথ সেখানে উপস্থিত। ওই দিন জানাজা

পড়ানোর পেছনের নায়ক আসলে ডিসি স্যার। যখন মৃতের প্রতিবেশী ও আত্মীয় কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ডিসি স্যারই আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন দ্রুত জানাজা পড়াতে।’ চরম অনিশ্চয়তার ওই সময়টিতে উপজেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ সরকারি কর্মকর্তার এমন উদ্যোগ ছিল আশা জাগানিয়া। চরম গুজবের সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয় সেই জানাজা। ভয় ও কুসংস্কারের কোঠরে আটকে থাকা অনেকে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হন ইউএনও শুভর সাহসী উদ্যোগে।

জানা গেছে, ঝিনাইদহের ওই ব্যক্তির নাম আব্দুস সামাদ। তিনি ফরিদপুরের কানাইপুরে কাজ করতেন। সেখানে তাঁর দেহে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে আঞ্জুমান মফিদুলের লোকজন মৃতদেহ নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ পৌরসভার খাজুরায় আসে। করোনার ভয়ে এলাকার কেউ এগিয়ে না আসায় জেলা প্রশাসকের উৎসাহে জানাজা পড়ান ইউএনও শুভ নিজেই।

সেদিনের পরিবেশ বর্ণনা করে বদরুদ্দোজা শুভ বলেন, ‘ওই দিন রাস্তার ধুলোবালি উড়ে কালবৈশাখী ঝড়ের লক্ষণ জানান দিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় খবর আসে একজন রোগী করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে মারা গেছেন। তাঁর আত্মীয়-পরিজন কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। বিপদের ওপর বিপদ, এক কঠিন সময় ছিল। ওই সময় ডিসি স্যার আমাকে জানাজা পড়াতে উৎসাহ দিলেন। আমি জানাজা পড়ালাম। এই ঘটনা এত মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেবে তা কখনো ভাবা হয়নি। এখনো অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ফোন করে অভিনন্দন জানান। মানুষের এই ভালোবাসা কখনো ভোলার নয়।’ মাঠ প্রশাসনে কাজ করতে গেলে বিভিন্ন সময় নানা ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়। এসব বিষয়কে সঙ্গে করেই কর্মকর্তারা কাজ করেন জানিয়ে ইউএনও শুভ বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা, ঝড়, বন্যা সব ধরনের দুর্যোগে আমাদের সবার আগে সাড়া দিতে হয়। এ জন্য মানুষের সহযোগিতা দরকার। আমরা এখনো দুর্যোগের মধ্যেই আছি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বড় ক্ষতির আশঙ্কা আছে। সবাইকে এখন আরো বেশি সচেতন থাকা দরকার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা