kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

স্বৈরাচার পতন দিবস আজ

তিন জোটের রূপরেখা উপেক্ষিত সব আমলে

এনাম আবেদীন    

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তিন জোটের রূপরেখা উপেক্ষিত সব আমলে

তিন জোটের রূপরেখা কী—দেশের নতুন প্রজন্মের বেশির ভাগই তা জানে না। শুধু তা-ই নয়, রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যেও অনেকে এখন ওই রূপরেখার কথা ভুলে গেছেন। কারণ রূপরেখায় বর্ণিত কোনো অঙ্গীকারই পরবর্তী সরকারগুলোর সময় মানা হয়নি। এ কারণে জনমনে সেটি ঢাকা পড়ে গেছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের মতে, ‘প্রথমে বিএনপির কারণেই তিন জোটের রূপরেখা হারিয়ে গেছে। কারণ তারা জামায়াতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে লাগল। পরে আওয়ামী লীগও বিএনপির পথেই হেঁটেছে। ক্ষমতার জন্য যা যা করা দরকার বড় দুই দলই সেগুলো করেছে।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বে তিন জোটের রূপরেখা হারিয়ে গেছে।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু অবশ্য মনে করেন, ‘তিন জোটের রূপরেখা হারিয়ে যায়নি, বরং চূড়ান্তভাবে সফল হয়েছে। কারণ স্বৈরাচারী এরশাদের পতন এবং সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠার নির্বাচন নিশ্চিত হয়েছে।’

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল এবং বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ দল মিলে এরশাদ-পরবর্তী সরকারব্যবস্থা কী হবে তার একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল। ওই বছরের ১৯ নভেম্বর ওই তিনটি জোট আলাদা সমাবেশে সেই রূপরেখা তুলে ধরে। এরপর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তিন জোটের বাইরে জামায়াত তখন যুগপৎ আন্দোলনে শামিল ছিল।

রূপরেখায় প্রধান দিক ছিল মৌলবাদ ও স্বৈরাচার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে প্রত্যয়। ছিল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। ওই রূপরেখাকে কেউ কেউ জাতীয় সনদ বলেও মনে করেন।

রূপরেখায় জাতীয় সংসদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে ভোটারদের ইচ্ছামতো ভোট দেওয়ার বিধান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে আবার গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে রূপরেখায়।

সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান বলেছেন, ‘বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা এবং আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতাদের গুম হওয়ার ঘটনাকে মানুষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই মনে করেন।’

তিন জোটের তুমুল আন্দোলনে এরশাদ পতনের পর ‘রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আচরণবিধি নামে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর হয়েছিল, যেটি জনসমুখে প্রকাশও করা হয়।

সেই অঙ্গীকারনামার তিন নম্বর ধারায় বলা হয়, ‘আমাদের তিনটি জোটভুক্ত দলসমূহ ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা এবং অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকবে। আমাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহ সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় প্রদান করবে না। এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা সমবেতভাবে প্রতিরোধ করবে।’

চার নম্বর ধারায় বলা হয়, ‘...স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের চিহ্নিত সহযোগী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের আমাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহে স্থান না দেওয়ার জন্য আমাদের ইতিপূর্বে প্রদত্ত ঘোষণা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।’

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এরশাদ পতন-পরবর্তী ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সাবেক দুই মন্ত্রিপরিষদসচিব এম কে আনোয়ার ও মোহাম্মদ কেরামত আলীকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিন জোটের রূপরেখা প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রথম ‘ধর্মের কার্ড’ খেলে এমন অভিযোগ আছে। বক্তৃতা-বিবৃতিতে দলটি বলতে থাকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলু ধ্বনি দেওয়া শুরু হবে।

অবশ্য ১৯৯৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগ নেতাদের আচরণেও ধর্মের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। ওই নির্বাচনে জামায়াত আলাদা করে নির্বাচন করে মাত্র তিনটি আসন পায়। আর আওয়ামী লীগকে তখন সমর্থন দেয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ তখন থেকেই মনে করা শুরু করে যে, ‘ধর্মের কার্ড’ খেলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়ে। মেয়াদের পরে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

অন্যদিকে, ২০০১ সালে বিএনপি মনে করতে শুরু করে তারা ভুল করেছে যার মাসুল দিতে হয়েছে ’৯৬ সালের নির্বাচনে। ফলে তারা ‘ধর্মের কার্ড’ ব্যবহার করে জামায়াত ও ইসলামপন্থী দলগুলোকে নিয়ে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তখন ওই আন্দোলনকে ভোট চোর, স্বৈরাচার ও রাজাকারের আন্দোলন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। দুই জোটের নেতাদের তরফ থেকেই স্বৈরাচার ও রাজাকারের দোসর হিসেবে পরস্পরকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দেওয়া এখনো অব্যাহত আছে।

২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অবশ্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অবিশ্বাসের সূত্রপাত এবং নানা ঘটনা-প্রবাহের মধ্যে দিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। কিন্তু ওই সরকারে বিএনপির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে আওয়ামী লীগসহ বিরোধীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে উচ্চ আদালত রায় দেন। পরবর্তী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হতে পারে বলে আদালত মত দিলেও সরকার আর সে পথে হাঁটেনি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন জোটের রূপরেখা পুরোটা অসফল এটা বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছে। তবে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ জন্য সবার সহযোগিতা লাগবে।’

১৯৯০ সালে সাতদলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি মনে করেন, ‘তিন জোটের রূপরেখা তো অনেক দূরের বিষয়, দেশের পবিত্র সংবিধানই আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে দিয়েছে। সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনকে আজ তারা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। সেখানে তিন জোটের রূপরেখা নিয়ে কথা বলে আর লাভ কী?’

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ১৯৯১ সালে জামায়াতকে বাদ দিয়ে বামপন্থীদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলে বিএনপির নাম জড়িয়ে অপপ্রচারের সুযোগ কম হতো। ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০, আওয়ামী লীগ ৮৮ ও জামায়াত ১৮ এবং বামপন্থীরা ১৩টি আসন পায়। সরকার গঠন করতে বিএনপির দরকার ছিল ১১টি আসন।

ইউপিল থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ : এ স্ট্যাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস’ বইতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ লিখেছেন, ‘বিএনপিকে জামায়াতের সহায়তায় ক্ষমতায় আনার অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দীন খান।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এরশাদ-জমানা কি আসলেই শেষ হয়েছে? বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সরকার এরশাদকে জেলে ঢোকায়, তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়ের করে। খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার তাঁর বিরুদ্ধে অনেক মামলা দায়ের করে এবং একটি মামলায় তিনি দণ্ডিত হন। পরে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে সব মামলায় জামিন দিয়ে জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ করে দেয়। তারপর ২০০৫ সালে এরশাদ তাঁর জাতীয় পার্টি নিয়ে মহাসমারোহে খালেদা জিয়ার জোটে যোগ দেন। ২০০৭ সালে এক-এগারোর কিছু আগে সমীকরণ আবার পাল্টে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে মহা-অংশীদার হন। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি ও তাঁর দল ক্ষমতার ভাগীদার।’

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। গত ১ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, “নূর হোসেন হয়তো চেয়েছিলেন এরশাদের শাসনামলের গণতন্ত্রের চেয়ে আরো উন্নত গণতন্ত্র এ দেশ পাবে। এই আশায় বুকে ও পিঠে ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখেছিলেন। কিন্তু গণতন্ত্র কি মুক্তি পেয়েছে?” সংসদের এই উপনেতার মতে, ‘সাংবিধানিকভাবে এখন দেশে যে শাসনব্যবস্থা চালু রয়েছে সেটি বাস্তবে গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্র।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা