kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সেই আবজালের মদদেই গড়ে ওঠে সিন্ডিকেট

এস এম আজাদ   

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সেই আবজালের মদদেই গড়ে ওঠে সিন্ডিকেট

স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরোর প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি চলছিল ২০০৬ সাল থেকে। মাঝে দুই বছর বন্ধ থাকলেও ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই চক্রের জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রের সদস্যসহ হোতা জসিম উদ্দিন ভুইয়া মুন্নু দুইবার গ্রেপ্তার হলেও থেমে থাকেনি তাঁদের কারবার। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জসিমের খালাতো ভাই আবদুস সালাম খান স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরোর প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস করতে গিয়ে ২০০৬ সালেই সন্দেহের আওতায় আসেন। তাঁকে দায়িত্ব থেকে দুই বছর সরিয়ে রাখলেও মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার বিতর্কিত কর্মকর্তা আবজালের তৎপরায় দায়িত্ব ফিরে পান। এমনকি খালাতো ভাই জসিম একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও আর সরানো হয়নি সালামকে। হয়নি সূত্র খুঁজে প্রেস ঘিরে তদন্ত। এর সুযোগে আড়ালে থেকেই ১০ বছর অপকর্ম চালাতে সক্ষম হয় ওই পারিবারিক সিন্ডিকেট। গ্রেপ্তার বা অভিযানেও থামেনি কারবার। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের দায় এড়ানোর চেষ্টায় একের পর এক অভিযোগ উঠলেও জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণে নেই কার্যকর পদক্ষেপ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে মহাখালীর স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরোর ছাপাখানায় ৬০০ টাকা বেতনে মেশিনম্যানের চাকরি পান প্রশ্ন ফাঁসচক্রের হোতা জসিমের খালাতো ভাই সালাম। ইনস্যুরেন্স কর্মী জসিম তাঁর বড় বোন শাহজাদী মীরার মাধ্যমে খালাতো ভাই সালামের সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁসের চুক্তি করেন। ২০০৬ সালে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও হাইকোর্টে রিট হলেও পরীক্ষা বাতিল হয়নি। শুধু ফল প্রকাশ ছয় সপ্তাহ স্থগিত করা হয়। তৎকালীন মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার পরিচালক সেফাত উল্লাহ সন্দেহ করেন সালামকে। এরপর সালামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা বা বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তখন প্রেসটির প্রডাকশন টেকনিশিয়ান এ টি এম মোস্তফা কামাল ও ইলেট্রিশিয়ান শরীফকে প্রেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁরা দায়িত্ব পালনকালে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠেনি। ২০০৯ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক হঠাৎ প্রেসটি পরিদর্শনে যান। ওই পরিদর্শনের পর এক ঘণ্টার নোটিশে আবার সালামকে প্রেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার কর্মকর্তা আবজাল এবং প্রশ্ন প্রণয়ন কমিটির এক সদস্যের ঘনিষ্ঠ ছিলেন সালাম। তাঁদের তদবিরেই সালাম ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। সালাম নিজেকে ‘আবজাল ভাইয়ের লোক’ বলে পরিচয় দিতেন বলে জানায় সূত্র। প্রশ্ন ফাঁসচক্রের টাকার একটি বড় অংশ যেত আলোচিত আবজালের কাছে। পরবর্তী সময়ে যাঁর হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য মেলে।

সূত্র মতে, ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর র‌্যাব জসিম উদ্দিন ভুইয়া মুন্নু, প্রেসের অস্থায়ী লোডার সাহেন শাহ ঠাকুরসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় র‌্যাব শেরেবাংলানগর থানায় একটি মামলা দায়ের করে। তবে জামিনে ছাড়া পেয়ে কারবার চালিয়ে যান জসিম। চলতি বছরের ২০ জুলাই সিআইডির হাতে গ্রেপ্তারের আগে জসিমের সিন্ডিকেটের ব্যাপারে অনুসন্ধানই হয়নি। তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যতম সহযোগী সানোয়ার হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারার জবাবন্দিতে বলেন, জসিম তাঁর ভায়রা সামিউল জাফর সিটুর মাধ্যমে র‌্যাব ধরার আগেই প্রশ্ন সরিয়ে ফেলেন। এরপর জসিমের স্ত্রী শিল্পী সারা দেশে তা পৌঁছে দিয়ে টাকা সংগ্রহ করেন। এই টাকায়ই জামিন করানোসহ বিভিন্ন স্থানে ম্যানেজ করা হয়।

২০১৬ সালের মে মাসে মানিকগঞ্জের একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হলে সালামকে প্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর মহাখালীর ডিওএসএইচের অফিস থেকে জসিমসহ চক্রের চারজনকে ফের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এ দফায়ও পরীক্ষা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে ছাড়া পেয়ে যান জসিম ও সালাম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সাল পর্যন্ত মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার পরিচালকের কক্ষের পাশে দুটি রুমে প্রশ্নের ট্রেসিং পেপার ও প্রুফ কপি রাখা হতো। পিয়নদের সহায়তায় সালাম ও জসিম সেখান থেকে ২০১৭ সালেও প্রশ্ন ফাঁস করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৮ সাল থেকে এগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। জানতে চাইলে স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরোর প্রেসের ম্যানেজার ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘বাদ দেওয়ার পর হঠাৎ আবার তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বড় লেভেলের ছত্রচ্ছায়ার কারণে একাধিকবার ধরা খেলেও হয়তো তাঁদের থামানো যায়নি।’

সূত্র জানায়, জসিমের বোন শাহজাহী আক্তার মীরা, ভাই মোস্তফা মোক্তার, বোনজামাই জাকির হোসেন দিপু, ভাতিজা পারভেজ খান, ভাগ্নে মুবিন ও রবিন, ভায়রা সামিউল জাফর সিটু, স্ত্রী শারমিন আরা জেসমিন শিল্পী, সহযোগী সানোয়ারসহ কয়েকজনকে নিয়ে পারিবারিক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তাঁরা প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস করে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, মেডিক্যাল ছাত্র ও শিক্ষকদের মাধ্যমে ভর্তীচ্ছুদের কাছে টাকার বিনিময়ে তা সরবরাহ করতেন। সিআইডি জসিম, সালাম ছাড়াও সানোয়ার, দিপু, পারভেজ খান, মীরা, ভগ্নিপতি আলমগীর হোসেন, ভাগ্নে মুবিন, সালামের ছেলে ইমন এবং খুলনা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী রেদওয়ানুর রহমান শোভনকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাবের হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তারের পরও চক্রটির কারবার চলার ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস সন্ত্রাস দমনে র‌্যাবই প্রথম ব্যতিক্রমী কার্যকর অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান চালিয়ে মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁসকারীচক্রকে ধরা হয়। এর পরও সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়া ও সামাজিক মিডিয়ার কিছু ঘটনা আমাদের নজরে আসছে। কেউ আবার করলে নজরদারির মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।’ মামলার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আমরা মামলা করেছি। পরবর্তী তদন্ত র‌্যাব করেনি। তদন্ত ও বিচার নিয়ে তাই আমরা বলতে পারব না।’

ভর্তি পরীক্ষায় প্রেস এবং চিকিৎসকদের জালিয়াতির ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশিদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এগুলো অনেক আগের ঘটনা। তার পরও বিষয়গুলো খোঁজ-খবর নিয়ে আমার জায়গা থেকে প্রয়োজনে যা করা দরকার সে ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা