kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ৪০ বছর পূর্তি

উৎসবের রঙে বেদনার ছায়া

আজিজুল পারভেজ   

৩০ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



উৎসবের রঙে বেদনার ছায়া

দেশবরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের স্মরণে গতকাল শিল্পকলা একাডেমিতে শোকসভার আয়োজন করে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন। ছবি : কালের কণ্ঠ

গালে হাত, নিমগ্ন দৃষ্টির হাস্যোজ্জ্বল বিশাল পোট্রেট। ছড়ানো ফুলের সৌরভে জ্বলছে মোমের আলো। পোট্রেটের নিচে লেখা ‘তুমিই তো একদিন দেখালে পারি আমরাও,/অভিনয় নিয়ে যেতে শিল্পের শিখরে/নূরলদীনের মতো নিভৃত কোলাহলে/তুমি উদযাপিত হবে ভাবীকালে/শিল্পের লড়াইয়ে আসা নতুন কারিগর খুঁজবে প্রেরণা/তোমার নান্দনিক দেহ আর কণ্ঠের ভাষ্যে’।

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চার দর্শক পূর্তি অনুষ্ঠানে এভাবেই স্মরণ করা হলো দেশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা নাট্যঋষি আলী যাকেরকে। অনুষ্ঠানের শুরুও হয় আলী যাকেরের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে।

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের বর্ষপূর্তি মানেই উচ্ছ্বাসমুখর আয়োজন। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সক্রিয় নাট্যকর্মীদের পুনর্মিলনী। আর নেতাদের আলোচনায় সংকট-সম্ভাবনা মূল্যায়ন। এবার চার দশক পূর্তিতে আয়োজন নতুন মাত্রায় পৌঁছতে পারত। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ম্লান হয়ে গেছে সব আয়োজন। তার ওপর আলী যাকেরের মতো শক্তিমান অভিনেতা-নির্দেশকের প্রয়াণ, সব মিলে বেদনা গ্রাস করেছে উৎসবের উচ্ছ্বাস। তার পরও বর্ষীয়ান নাট্যজনদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে এ দেশের নাট্যচর্চার সংকট-সম্ভাবনা। এসেছে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং দেশে মৌলবাদী অপতৎপরতার প্রসঙ্গও। ঘোষিত হয়েছে শিল্পের আলোয় দুঃসময় ও অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।

গতকাল রবিবার বিকেলে জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয় প্রয়াত নাট্যজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে। নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে ছিল বিগত দিনে ফেডারেশনে নেতৃত্ব দেওয়া সভাপতি-সম্পাদকদের সম্মাননা ও আলোচনা পর্ব। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। সভাপতিত্ব করেন নাট্যজন লাকী ইনাম। অনুভূতি ব্যক্ত করেন সাবেক সভাপতি আতাউর রহমান, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মামুনুর রশীদ, ম. হামিদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেবপ্রসাদ দেবনাথ দুলাল, ঝুনা চৌধুরী, আক্তারুজ্জামান ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজিদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির সচিব মো. নওসাদ হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন নাট্যাভিনেতা খন্দকার শাহ আলম।

এ দেশের নাট্যচর্চায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া মামুনুর রশীদ তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন নাট্যচর্চার সামগ্রিক চিত্র। তিনি বলেন, ‘গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রথম সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। শুরু থেকে আমি ফেডারেশনের বিরোধিতা করেছিলাম। আজ বুঝতে পারছি আমার সেই বিরোধিতা অমূলক নয়। কারণ সাংগঠনিকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে। যার কারণে নাটকের মানও এখন নিম্নমুখী। ঢাকার বাইরের নাটকের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ঢাকার নাটকের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাইরের নাটকের উৎকর্ষতা যদি বৃদ্ধি না পায় তাহলে আমি মনে করি নাটকের সামগ্রিক মান এখনো অনুন্নত।’ তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে শিল্পকলা মিলনায়তনগুলো এখনো নাটক মঞ্চায়নের উপযোগী হয়নি। হলের লাইট এবং সাউন্ডের মান খুবই খারাপ। এ বিষয়ে ফেডারেশনকে এগিয়ে আসতে হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীসহ দেশের সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভেদ থাকলেও এটা ভেবে ভালো লাগছে যে আমাদের গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এখনো অখণ্ড আছে।’

পেশাদার নাট্যচর্চার প্রসঙ্গটিও উঠে আসে মামুনুর রশীদের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘নাট্যকর্মীদের স্যালারি গ্র্যান্ড চালু করার ব্যাপারে আমরা বারবার সরকারের কাছে ধরনা দিলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেটির বাস্তবায়ন হচ্ছে না। একজন ক্রিকেটার বছরে যে পরিমাণ টাকা পায় সে পরিমাণ টাকা দিয়ে প্রায় এক হাজারের ওপর নাট্যকর্মীর স্যালারি গ্র্যান্ড দেওয়া যায়। ফেডারেশন যদি এ বিষয়ে কোনো দায়িত্ব না নেয় তাহলে আমরা নাট্যকর্মীরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের কাছ থেকে স্যালারি গ্র্যান্ড আদায় করে নেব।’

নাসির উদ্দীন ইউসুফের বক্তব্যে উঠে আসে শিল্পচর্চার সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পাশাপাশি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার জন্য নাট্যকর্মীরা নাটকের মাধ্যমে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। মামুনুল হক গং সরকারকে হুমকি দিচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার কথা বলছে। স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মামুনুল হকরা দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, নাট্যকর্মীরা তাদের সে ষড়যন্ত্রকে কখনো বাস্তবায়ন হতে দেবে না।’ এ সময় তিনি আগামী ১ ডিসেম্বর (আগামীকাল মঙ্গলবার) শিল্পকলা একাডেমি থেকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর পর্যন্ত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

সম্মাননা পর্ব শেষে মিলনায়তনে ছিল নাটক থেকে পাঠ, নাটকের গান, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা।

চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগেও গতকাল ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রয়াস লক্ষ করা গেছে। ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা