kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সিলেট নগরীর ‘ডাস্টবিন’ সুরমা

সিলেট অফিস   

৩০ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সিলেট নগরীর ‘ডাস্টবিন’ সুরমা

নদীর ঘোলা পানি আর ঢেউয়ে গা মিশিয়ে ভেসে চলেছে নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা। সিলেট শহরতলির কুমারগাঁও এলাকায় সুরমা নদীর ওপর নির্মিত শাহজালাল-৩ সেতুতে দাঁড়িয়ে গতকাল রবিবার বিকেলে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলা স্রোতের দিকে কিছুক্ষণ চোখ রাখলে সহজেই আঁচ করা যায় প্রতিনিয়ত কী ভয়াবহ মাত্রায় দূষণের শিকার হয়ে চলেছে নদীটি।

কলকারখানা ও বাসাবাড়ির বর্জ্য, সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে নানা খাতের ব্যবসায়ীদের ময়লা ফেলার স্থান যেন এই সুরমা নদী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পলিথিন ও প্লাস্টিকের আগ্রাসন দূষণের ভয়াবহতা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। যেন পুরো নদীকেই গিলে ফেলছে প্লাস্টিক আর পলিথিন। সিলেট সিটি করপোরেশন, সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে সিলেট নগরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালেও সুরমার দূষণ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেই।

সিলেটে সুরমা দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে দূষণের শিকার। কল কারখানার বর্জ্য তো আছেই, নগরের নালা-ড্রেনের ময়লা পানিও এসে পড়ছে এই নদীতে। সুপারি পচানোর জন্য ব্যবহার হচ্ছে এই নদী। মাছের শুঁটকি শুকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে নদীর তীর। দোকানপাট ও বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা এবং সবজি ও ফলের ব্যবসায়ীদের উচ্ছিষ্ট ফেলার নিরাপদ স্থানও এই নদী। বিশেষ করে নগরের উপশহর, মেন্দিবাগ, তোপখানা, চাঁদনীঘাট, ভার্থখলা, টেকনিক্যাল রোড, শেখঘাট, কলাপাড়া, কাজিরবাজার এলাকায় গড়ে ওঠা কারখানার ময়লা ফেলার অবধারিত ঠিকানা সুরমা নদী। বিভিন্ন এলাকায় টয়লেটের পাইপে সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। বর্ষায় নদীতে স্রোত থাকায় এর বিরূপ প্রভাব বেশি টের পাওয়া না গেলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিতে এসব বর্জ্যের দুর্গন্ধ বিষাক্ত করে তোলে পরিবেশ। আবর্জনার স্তূপ আর দুর্গন্ধে মনে হতেই পারে যে ভুল করে বুঝি সিলেট সিটি করপোরেশনের ভাগাড়ে ঢুকে পড়েছি।

এসব দূষণকে ছাপিয়ে বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে পলিথিন আর প্লাস্টিক বর্জ্য। বিশেষ করে নগর এলাকায় নদীতে এই দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ

করেছে। গতকাল শেখঘাট এলাকা থেকে কালিঘাট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় সুরমা নদীর তীর ঘুরে দেখা গেছে প্লাস্টিক আগ্রাসনের ভয়াল চিত্র। কাজিরবাজার এলাকায় নদীতীরে গেলেই বোঁটকা গন্ধে টেকা দায়। যতদূর চোখ যায় তীর ও ঢাল বেয়ে নদীর পানি পর্যন্ত পুরো অংশেই পলিথিন আর প্লাস্টিকের আধিক্য। কোথাও কোথাও এক-দেড় ফুট পুরু হয়ে আছে পলিথিনের স্তর। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় এখন নদী শুকিয়ে স্থানে স্থানে চর জেগে আছে। সেসব চরও পলিথিনের আগ্রাসন থেকে মুক্ত নয়। কোথাও কোথাও নদীর পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিক পণ্য ও পলিথিন।

প্লাস্টিক আর পলিথিনের ভয়াবহতা নিয়ে নগর সংস্থাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ রক্ষায় এবং নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রায়ই নানা ধরনের প্রচার চালায়। কখনো নিজেরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনা করে। কিন্তু এ বিষয়টি তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।

একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেশির ভাগ সংগঠন সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি প্রচারণার বিষয়টিও হয়তো মাথায় রাখে। সে কারণে সাধারণত কিনব্রিজসংলগ্ন সুরমা নদীর তীরেই এসব কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। অথচ কিন ব্রিজের দুইপাশে দেড়-দুই শ মিটারের মধ্যে আবর্জনার পাহাড় তাদের চোখে পড়ে না।’

সিলেটের পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সভাপতি আশরাফুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নানাভাবে কর্মসূচি দিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে উদাসীনতা রয়েছে। বিষয়টিকে তাদের আরো গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। নগরের মাঝখান দিয়ে একটি নদী বয়ে গেলেও তা নগরবাসীর কোনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আমরা এর মূল্যই বুঝতে পারছি না।’ নদীকে দূষণ থেকে বাঁচাতে সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদী কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।’

এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে গতকাল একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা