kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চমেক হাসপাতাল চত্বরে দোকান সিন্ডিকেট

ভাড়ার টাকা গিলছেন তাঁরা

► তদন্তে দুদক, চারটি অ্যাকাউন্ট জব্দ
► চাওয়া হয়েছে ১০ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৩০ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাড়ার টাকা গিলছেন তাঁরা

সুপারশপ, ক্যান্টিন, পানের দোকান। সবই গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল চত্বরের সরকারি জায়গায়। আর এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে চমেকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক সিন্ডিকেট। ওই সব দোকান থেকে প্রতিমাসে ভাড়া ওঠে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা। বছরের হিসাবে টাকার অঙ্কে তা দাঁড়ায় কোটি টাকার ওপরে। সরকারি কোষাগারে না দিয়ে ভাড়ার কোটি টাকা নিজেরাই পকেটে ভরছেন ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। শুধু তাই নয়, সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানিসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিলেও এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরকার এক টাকাও রাজস্ব পাচ্ছে না। এভাবে বছরের পর বছর অনিয়ম চললেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব দোকানের ভাড়া তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন দোকান থেকে কর্মচারীদের একাধিক সিন্ডিকেট প্রতিমাসে আরো কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। বিভিন্ন দোকান কম দামে ভাড়া লাগিয়ে একাধিক সিন্ডিকেটের বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামের একটি দল এই অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছে। সম্প্রতি শুরু হওয়া এই তদন্তে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দেওয়াসহ ব্যাপক অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে। এ ব্যাপারে দুদক চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-২-এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, নার্সিং এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চারটি ক্যান্টিন সরকারি জায়গায় হলেও এসব ক্যান্টিন থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। মিলছে না বিদ্যুৎ বিলও। ভাড়ার টাকাও কর্মচারী সংগঠনের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, চমেক হাসপাতালের ওই চারটি সংগঠনের (নার্সিং, মেডিকপস, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছি। অগ্রণী ব্যাংকের চমেক হাসপাতাল শাখার ওই চার হিসাবে মোট ২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৯৬ টাকা রয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার ক্যান্টিন ভাড়ার টাকা জমার চারটি অ্যাকাউন্ট জব্দের পাশাপাশি গত ১০ বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব কর্মচারী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যাংক হিসাবও চাওয়া হয়েছে।

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ক্যান্টিন ও পানের দোকানগুলোর ব্যাপারে জানতে চেয়ে চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আফতাবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগের বিষয় শুনে তিনি বলেন, ‘আমি একটি অনুষ্ঠানে আছি। পরে কথা বলব।’

চতর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতি ও মেডিকপসের (মেডিক্যাল কো-অপারেটিভ সোসাইটি) অধীনে হাসপাতালে একটি ক্যান্টিন, একটি সুপারশপ ও একটি পানের দোকান রয়েছে। এ দুটি সংগঠনের মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির সমিতির সভাপতি ও মেডিকপস সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা আব্দুল মতিন মানিক বলেন, ‘আমাকে জেনে বলতে হবে দোকানগুলো কবে শুরু হয়েছে।’

তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি সাদেকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাসে তিনটি দোকানের জায়গা বাবদ ৬০০ টাকা খাজনা এবং বিদ্যুৎ ও পানিবাবদ এক হাজার দিচ্ছি। আমাদের অ্যাকাউন্ট জব্দের ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি। এরই মধ্যে দুদক থেকে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে তা আমরা দিয়েছি।’

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, চমেক  হাসপাতালের পূর্ব গেটের পাশে ২০০০ সালে চালু হওয়া সুপারশপ মেডিকপসের দৈনিক ১০ হাজার টাকা হিসাবে মাসে ভাড়া আসে তিন লাখ টাকা। সেই হিসাবে বছরে এই দোকান থেকে মেডিকপস ভাড়া পাচ্ছে ৩৬ লাখের বেশি। ফলে গত ২০ বছরে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংগঠনটির ঊর্ধ্বতন এক নেতাকে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে মাসিক নিয়মিত চাঁদা দিতে হয় বলে কয়েকজন কর্মচারী জানান।

এদিকে নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে থাকা নার্সেস ক্যান্টিনের মাসে ভাড়া ৮১ হাজার টাকা। এর মধ্যে একটি পানের দোকানও রয়েছে। এখানেও ভাড়ার বাইরে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে গোপনে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় দুই যুগ আগে এই ক্যান্টিন চালু করা হয়। কয়েক বছর আগে ভাড়া ছিল মাসে দেড় লাখ টাকা।

তৃতীয় শ্রেণির একটি ক্যান্টিন ও দুটি পানের দোকান মিলে ভাড়া মাসে দুই লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে দুটি পানের দোকানের ভাড়া এক লাখ সাত হাজার টাকা। এই তিন দোকানে বছরে ভাড়া ২৮ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি। সেই হিসাবে গত ২০ বছরে পাঁচ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি তুলে নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির অধীনে থাকা একটি ক্যান্টিনের মাসে ভাড়া এক লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং একটি পানের দোকানের ভাড়া এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এই দুই দোকান থেকে সমিতি আদায় করছে মাসে তিন লাখ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব সংগঠনের কয়েকজন নেতা জানান, সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে দোকান করে ভাড়া আদায় করা এসব টাকার বড় একটি অংশ নামে-বেনামে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে কর্মচারী সংগঠনের নেতারা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। এর প্রমাণ মিলেছে গতকাল দুদকের অ্যাকাউন্ট জব্দে। চারটি সংগঠনের এসব অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকা থাকার কথা। কিন্তু সেখানে আছে মাত্র সাড়ে ২৯ লাখ টাকা।

হাসপাতালে প্রতিবছর একাধিক অডিট হলেও অবৈধভাবে গড়ে তোলা এসব দোকানের কোনো অডিট হয় না। এ পর্যন্ত সব অডিটেই হাসপাতাল এলাকায় সরকারি জায়গার ওপর ব্যবসা করে যাওয়া ক্যান্টিনসহ সব দোকানকে বাইরে রাখা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা