kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শুভসংঘের উদ্যোগ

বাঁচার অবলম্বন ‘গোলাপী স্টোর’

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঁচার অবলম্বন ‘গোলাপী স্টোর’

কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দোকান পেয়েছেন লালমনিরহাটের সাপটানা এলাকার গোলাপী বেগম। জেলা প্রশাসক নিজে কেনাকাটা করে গতকাল দোকানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

গোলাপী বেগম। বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। থাকেন সরকারের দেওয়া গৃহহীনদের জন্য তৈরি লালমনিরহাট পৌর শহরের সাপটানা ১ নম্বর আবাসনের একটি ঘরে। শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় গোলাপী বেগমের দুই বেলা অন্ন জোটে বোন আনোয়ারা বেগমের সহায়তায়। তিনি আবার অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। সেখান থেকে যা পান, তা দিয়ে নিজে চলেন এবং বোন গোলাপী বেগমকে চালান। এভাবে দুঃখ-কষ্টে দিন কাটলেও নিজের চিকিৎসা করাতে অক্ষম গোলাপী। অসহায় এই গোলাপী বেগমের নিশ্চয় সুদিন ফিরবে। কারণ তিনি এখন ‘গোলাপী স্টোরের’ মালিক। কালের কণ্ঠ’র শুভসংঘ তাঁকে মালপত্রসহ দোকানটি গড়ে দিয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে দোকানটি তাঁকে হস্তান্তর করা হয়। দোকান পেয়ে ভীষণ খুশি তিনি। আপ্লুত গোলাপী বেগম ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান শুভসংঘকে। আর মানবিক এই উদ্যোগ নেওয়ায় উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানিয়েছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিসহ আবাসনের বাসিন্দারা। আবাসনের মসজিদের পাশে চালু করা হয়েছে দোকানটি।

একসময় স্বামী নুর মোহাম্মদের সঙ্গে গোলাপী বেগম লালমনিরহাট রেলস্টেশন এলাকায় চালাতেন ‘গোলাপী হোটেল’। তখন নিজের বাড়ি ছিল। সংসারও চলত চমৎকার। কিন্তু হঠাৎ স্বামী নুর মোহাম্মদ অসুস্থ হয়ে পড়লে বারবার তাঁর চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় পরিবারটি। ছেড়ে দিতে বাধ্য হন হোটেলটিও। এর পরও স্বামীকে  বাঁচাতে পারেননি। ১৪ বছর আগে মারা যান নুর মোহাম্মদ। দত্তক নেওয়া সন্তান মমিনুলসহ বিপাকে পড়েন গোলাপী। এই অবস্থায় মা-ছেলেকে আবাসনে আশ্রয় দেন স্বজনরা।

যে কারণে ‘গোলাপী স্টোর’ : ‘লালমনিরহাটে বর্বরতা : এক পা মাথার ওপর আরেক পা হাতে’ শিরোনামে গত ১১ জুন কালের কণ্ঠ’র প্রথম পাতায় একটি মর্মস্পর্শী সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের পর মমিনুলের মা গোলাপীকে ‘বাঁচার অবলম্বন’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় শুভসংঘ। এরই প্রতিফলন ঘটল গতকাল গোলাপী বেগমকে ‘গোলাপী স্টোর’ হস্তান্তরের মাধ্যমে।

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন : লালমনিরহাট শহর থেকে সামান্য দূরে চাঁদনিবাজার। সেখান থেকে এক কিলোমিটার ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা পার হলে সাপটানা ১ নম্বর আবাসন। আবাসন এলাকায় প্রবেশের মুখে রঙিন টিন-কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘গোলাপী স্টোর’। দোকান তৈরি এবং বিক্রির জন্য পণ্যসামগ্রী কিনে দিয়েছে শুভসংঘ। দোকানটি উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল সেখানে আয়োজন করা হয় একটি অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কবি ও সমাজকর্মী ফেরদৌসী রহমান বিউটি, লালমনিরহাট সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, শুভসংঘের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি ও কালের কণ্ঠ’র রংপুর ব্যুরো প্রধান স্বপন চৌধুরী, লালমনিরহাট প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান ডিফেন্স এবং সাপটানা ১ নম্বর আবাসন বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি রাশেদ ইসলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে কালের কণ্ঠ ও শুভসংঘের পক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্বাগত বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠ’র লালমনিরহাট প্রতিনিধি হায়দার আলী বাবু।

জেলা প্রশাসক শুভসংঘকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘একটি অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে অসামান্য মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে শুভসংঘ। এতে আমাদের যুক্ত করায় আমরা কৃতজ্ঞ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গোলাপী বেগমকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’

ফেরদৌসী রহমান বিউটি বলেন, ‘গোলাপী বেগমকে বাঁচার অবলম্বন হিসেবে দোকান গড়ে দেওয়া একটি মহৎ উদ্যোগ। মমিনুলের ঘটনাটি আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছিল। যে কারণে তাঁর মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে কালের কণ্ঠ’র শুভসংঘ। আমরা উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

স্বপন চৌধুরী বলেন, “কালের কণ্ঠ’র পাঠক সংগঠন হিসেবে শুভসংঘ যাত্রা শুরু করলেও এটি এখন দেশের বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী-সামাজিক সংগঠন; যার নেতৃত্বে রয়েছেন দুই বাংলায় বিপুল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন।”

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘের শরীফ আহমেদ মোহন, মিঠু খন্দকার, জ্যাকলিন সামস কাব্য, মোবাশ্বেরা জান্নাত সেতু, জেনিফার সামস নদী, রনি ইসলামসহ অন্যরা।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন স্বপন, আনিছুর রহমান লাডলা, নিয়াজ আহমেদ শিপন, তন্ময় আহমেদ নয়ন, এস কে সাহেদ ও হাসান মাহমুদ।

আলোচনা শেষে ফিতা কেটে ‘গোলাপী স্টোর’ উদ্বোধন করেন অতিথিরা। পরে প্রথম গ্রাহক হিসেবে কেনাকাটা করেন জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর এবং কবি ও সমাজকর্মী ফেরদৌসী বেগম বিউটি।

গোলাপী বেগম যা বললেন : মালপত্রসহ নতুন দোকানঘর পেয়ে ভীষণ খুশি গোলাপী বেগম। উদ্বোধনের পর দোকানে বসেন তিনি। অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, “ছেলেটি মাঝে মাঝে কাজ করলেও বেশির ভাগ সময় বেকার থাকে। আমি অসুস্থ থাকায় কিছু করতে পারি না। মানুষের বাড়িতে কাজ করে আমার বোন অনেক কষ্টে আমাদের চালায়। আমি কখনো কল্পনা করিনি আমাকে কেউ এভাবে বাঁচার অবলম্বন করে দেবে। কালের কণ্ঠ’র শুভসংঘ আমার মতো অসহায় একজনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ওরা আমার নতুন জীবন দিয়েছে। ওদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আশা করছি এই দোকান দিয়ে ভালোভাবে চলতে পারব।’

 

মন্তব্য