kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নিলামে তিন প্রতিষ্ঠান ১৯০০ কর্মী বিপাকে

টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়েছেন মালিক

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




নিলামে তিন প্রতিষ্ঠান ১৯০০ কর্মী বিপাকে

চট্টগ্রাম ইপিজেডের ৮ নম্বর সেক্টরের ‘নর্ম আউটফিট অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ’ ২০১৭ সালের শেষ দিকে স্ত্রী ও শ্বশুরের নামে কিনে নেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী নাজমুল আবেদীন। দেড় বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা সম্পদ মূল্যের কারখানাটি ফেলে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী এই ব্যবসায়ী ২০১৯ সালের শুরুর দিকে পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেন। অথচ তখন প্রতিষ্ঠানটির বিপরীতে শুধু ব্যাংকের দেনা প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ী নাজমুল মাত্র এক বছরের জন্য সাত কোটির মতো বিনিয়োগ করে এর ১০ গুণ অর্থ নিয়ে বিদেশে পালানোর সময় একই ইপিজেডে নিজের অন্য দুই গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান এঅ্যান্ডবি আউটওয়্যার ও কোল্ড প্লে স্কুল প্রডাক্টস লিমিটেডকে আরো প্রায় দুই শ কোটি টাকার ঋণে ডুবিয়ে দিয়ে গেছেন। আর ঋণের ফাঁদে ফেলে দেশের চারটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ২৭৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে তিন গার্মেন্ট কারখানার এক হাজার ৯০৮ শ্রমিকের বেতন-ভাতা, বেপজার পাওনা আর অ্যাকসেসরিজ সাপ্লায়ারদের আরো অন্তত ৫০ কোটি টাকা না দিয়েই গোপনে দেশ ছাড়েন তিনি।

এদিকে দীর্ঘদিন মালিকপক্ষের সাড়া না পেয়ে বেপজার পাওনা এবং শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন তিন প্রতিষ্ঠানকে গত ২৩ নভেম্বর নিলামে তুলেছে চট্টগ্রাম ইপিজেড কর্তৃপক্ষ। কারখানাগুলো নতুন মালিকানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে বেপজা সূত্র জানিয়েছে। নাজমুলের মালিকানাধীন তিন কারখানা থেকে বেপজার পাওনা প্রায় দুই লাখ ৮৬ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া এক হাজার ৯০৮ জন শ্রমিকের ৯ মাসের বেতন-ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ কয়েক কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গার্মেন্ট ব্যবসায় আসার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ গ্র্যাজুয়েট নাজমুল আবেদীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে দীর্ঘদিন বড় পদে চাকরি করেছেন। ব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তিনি অল্প মূলধনী প্রতিষ্ঠানকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে বড় ঋণ নিয়ে ব্যাংককেও ফাঁসিয়ে দিয়ে গেছেন।

নাজমুলের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেসরকারি চারটি ব্যাংকের ২৭৭ কোটি টাকা ঋণের তথ্য রয়েছে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে কোন ব্যাংকের কত টাকা পাওনা সে তথ্য দিতে রাজি হয়নি কোনো পক্ষ। ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা  ঋণ নিয়ে নাজমুলের পলাতক থাকার কথা স্বীকার করলেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।

নাজমুল আবেদীনের কারখানায় অ্যাকসেসরিজ সরবরাহ করতে গিয়ে ফেঁসেছেন অসংখ্য সাপ্লায়ার। ব্যাংক ও বেপজার বাইরে তাঁদেরও অন্তত ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছেন নাজমুল। তাঁদেরই একজন বেলাল উদ্দিন। তাঁর ‘ব্লু প্যাক’ নামের প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সাল থেকে নাজমুল আবেদীনের কারখানাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ সরবরাহ করে আসছিল। বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সময় বেলাল উদ্দিনের প্রায় দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা বকেয়া ছিল নাজমুলের কাছে। নাজমুলের কারখানাগুলোর চাহিদার বিপরীতে ব্যাংকে ঋণপত্র খোলার সুদ বাবদ পাওনার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় তিন কোটি টাকা। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে ই-মেইলে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রাখলেও মাস তিনেক ধরে সেটাও বন্ধ করে দিয়েছেন নাজমুল। এখন পাওনা আদায়ে চেক প্রতারণা মামলার উদ্যোগ নিয়েছি।’

ইপিজেড সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইপিজেডের ৮ নম্বর সেক্টরের নর্ম আউটফিট নামের কারখানাটি ২০১৭ সালের শেষ দিকে স্ত্রী সোহেলা আবেদীন ও শ্বশুর এ কে এম জাহেদ হোসাইনের নামে কিনে নেন নাজমুল। এর মধ্যে স্ত্রীর শেয়ার ৯০ শতাংশ। কিনে নেওয়ার আগে মূলত নাজমুল আবেদীনের এঅ্যান্ডবি আউটওয়্যারের সাব কন্ট্রাক্টের কাজ করত নর্ম আউটফিট। সেই প্রতিষ্ঠানটি মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কিভাবে ব্যাংক থেকে ৭৫ কোটি টাকা ঋণ পেল সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না বেপজা-সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নর্ম আউটফিটের আগের মালিকদের একজন বলেন, ‘কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, নাজমুল কারখানাটি কিনেছেনই ব্যাংক ঋণ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে।’

সপরিবারে বিদেশে পালিয়ে গিয়েও দীর্ঘ সময় বেপজাকে বিভ্রান্তিতে রেখেছেন নাজমুল। যতবারই যোগাযোগ হয়েছে দেশে এসে আবার ব্যবসার হাল ধরবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। এমনকি বেপজার পাওনা পরিশোধে কারখানা নিলামের উদ্যোগ নিলে হাইকোর্টে রিট করে নিলামের ওপর প্রায় চার মাসের স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছিলেন।

বেপজার মহাব্যবস্থাপক নাজমা বিনতে আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিরাজমান পরিস্থিতিতে থানায় মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। আর মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বেপজার বকেয়া পাওনাদি পরিশোধে পদক্ষেপ না নেওয়ায় বেপজা কারখানা তিনটিকে টার্মিনেট করে। এখন শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধের জন্য কারখানা তিনটি নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

 

মন্তব্য