kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে বাসিন্দারা

জহিরুল ইসলাম   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে বাসিন্দারা

‘ওরা সন্ধ্যায় আসে, বিকেলে আসে। মাদক বেচাকেনা করে কি না কইতে পারি না। তবে এরা খায়। বাসার ছাদে যায়গা। গেইটটেইট নাই তো। এই জন্য ভয়ে থাহন লাগে। বেশি কিছু কন যায় না। পুলিশের ওপরও হামলা করে। পুলিশ কিছু কইলে তাগোরে ধমকায়, একলা পাইলে হুমকি-ধমকি দেয়।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির বাসিন্দা শিউলি আক্তার।

গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে শিউলি আক্তারের কথার সত্যতা পাওয়া যায়। শাহজাহানপুর রেলওয়ে মৈত্রী সংঘ কলোনির মাঠে দুপুর ২টার দিকেও কিশোরদের ভাগে ভাগে আড্ডা দিতে দেখা যায়। মাঠের মূল ফটকের পাশে দাঁড়ানো দুই কিশোর কাকে যেন বারবার ফোন করছিল। আধা ঘণ্টা পর সেখানে এসে উপস্থিত হয় আরো চার কিশোর। তাদের মধ্যে একজনকে সুবাস সম্বোধন করে ওই দুই কিশোরের একজন বলে ওঠে, ‘কিরে মামা, এতক্ষণ লাগে আনতে!’ কয়েক মিনিট পর সবাই মাঠের মাঝ বরাবর পূর্বপাশে গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ায়। সাদা কাগজের একটা পোঁটলা খোলে। একজন বাড়িয়ে দেয় সিগারেট। বোঝা যায় গাঁজা সেবনের জন্যই তাদের এই জটলা। এটি একটি গ্রুপের চিত্র। পাঁচ-ছয়জনের এমন কয়েকটি জটলা চোখে পড়ে মাঠের বিভিন্ন অংশে।

মাঠের পাশ দিয়ে কাদের ব্যাপারী বাড়ির উল্টোপাশে কলোনির ১৬ নম্বর ভবনের পেছনে আরো কয়েকজনকে দেখা গেল মোবাইল ফোনের অ্যাপ ব্যবহার করে লুুডু খেলছে। কী করছ তোমরা, বাসা কোথায়—জানতে চাইলে এক কিশোর মুখ থেকে সিগারেট হাতে নিয়ে ধমকের সুরেই বলল, ‘পুরা কলোনি আমাগো। বাসাটাসা নাই। এই জায়গায় জুয়া খেলি। তো কী হইছে। জান মিয়া, কত দেখলাম।’ একজন তাকে চুপ করিয়ে বলল, ‘ভাই, মাল (নেশাদ্রব্য) বেশি পইড়া গেছে।’

এসব কিশোরকে এলাকার লোকজন ভয় পায় বলে জানালেন শিউলি আক্তার। তিনি বলছিলেন, ‘আমার স্বামী পুলিশে চাকরি করে। তাও ওরারে কিছু বলতে পারে না। উনি একা মানুষ না। ওরা অনেক। পরে যদি পথে একা পাইয়া মাইরধইর করে। এ জন্য বেশি জোর কইরা কহা যায় না। কলোনিটাই খারাপ।’

শিউলির কথায় জানা গেল, কলোনিকেন্দ্রিক ১০-১৫টি কিশোর গ্রুপ আছে। এসব গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তর ও দক্ষিণ শাহজাহানপুর, রেলওয়ে কলোনি ও আশপাশের এলাকা, আউটার সার্কুলার রোড, কাদের ব্যাপারী বাড়ি এলাকা, শাহজাহানপুর রেলওয়ে মৈত্রী সংঘ কলোনি মাঠে কিশোরদের আড্ডা চলে দিনে-রাতে। জায়গাগুলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এলাকায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি থাকায় তাদের অনুসারী কিশোরদেরও ছোট ছোট গ্রুপ রয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট কোনো নাম নিয়ে তারা চলে না। মাদক বেচাকেনা, মাদকসেবন, আড্ডা ও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে এরা। এসব বিষয়ে জানতে গত মঙ্গলবার স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মির্জা আসলাম আসিফকে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে বারবার ফোন দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ওয়ার্ডের প্রায় সব সড়কের ফুটপাতে মাছ, মুরগি ও মাংসের দোকান বসানো হয়। এসব দোকান থেকে কিশোর গ্রুপগুলোর অনেকে চাঁদাবাজি করে। পুলিশ ধরলেও পরে ছাড়া পেয়ে যায়।

শাহজানপুর থানার শহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে ধাওয়াটাওয়া দিই, ধরে আনি। ছেড়ে দিলে যেই সেই। আসলে যুবক পোলাপান তো। তার ওপর বেশির ভাগ নিম্ন আয়ের মানুষ। রেলওয়ে কলোনির বেশির ভাগই ভাড়াটিয়া। মূল বাসিন্দারা না থেকে ভাড়া দিয়ে রাখে। এখানে একসময় কয়েক লাখ বস্তিবাসী থাকত। মাদকের আখড়া ছিল। এখন অনেকটা কমে গেছে।’

ওসি বলছিলেন, ‘কলোনিতে যারা থাকে তাদের আয়ের উৎস না থাকার কারণে অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ে। তবে মাদক সেবন করে কি না জানি না। আগের চেয়ে পরিবেশ অনেক ভালো। শুধু বিকেলের দিকে হয়তো পোলাপান আড্ডা দিতে বিভিন্ন বাসার ছাদে উঠে যায়।’

 

মন্তব্য