kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

করোনায় দুঃসময়

এই শীতে ফুসফুস সুরক্ষাই চ্যালেঞ্জ

তৌফিক মারুফ   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এই শীতে ফুসফুস সুরক্ষাই চ্যালেঞ্জ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে এ পর্যন্ত ছয় হাজার ৫২৪ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে সরকারের তরফ থেকে; যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বয়সই ৫০ বছরের বেশি। তাঁদের বেশির ভাগের আগে থেকে অন্য রোগের জটিলতা ছিল, সবচেয়ে বেশি ছিল ফুসফুসে সংক্রমণের জটিলতা। অর্থাৎ করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে যাদের ফুসফুসে সংক্রমণ তীব্র হচ্ছে, তাদেরই বিপদের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। অনেককে কৃত্রিম অক্সিজেন সংযোজনের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা যাচ্ছে, আবার অনেকের শেষরক্ষা হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি শীত মৌসুম করোনাভাইরাসের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণই হচ্ছে ফুসফুসের সংক্রমণ। শীতে যেহেতু এ দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়, আবার ঘরবাড়ি বা কর্মস্থলে বেশির ভাগ সময়ই দরজা-জানালা বন্ধ থাকে, ফলে দুটি ক্ষেত্রেই যেকোনো ভাইরাস বা জীবাণু সহায়ক পরিবেশ পেয়ে থাকে। এই ভাইরাস বা জীবাণু সহজেই মানুষকে কাবু করতে পারে। আর এমন সংক্রমণের শিকার হওয়া রোগীদের ওপর যদি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে, তবে ফুসফুসের অবস্থা আরো জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৫ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটে এক বছরে। দিনে ৬৮ জন ও প্রতি ঘণ্টায় মারা যায় তিনটি শিশু। পাঁচ বছরের বেশি অর্থাৎ অন্যান্য বয়সের আরো কিছুসংখ্যক মানুষেরও মৃত্যু ঘটে নিউমোনিয়ায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ সময়ে ছোট-বড় সবারই সতর্ক থাকতে হবে ফুসফুস সুরক্ষায়। মাস্ক ব্যবহার ফুসফুস সুরক্ষার প্রধানতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

এদিকে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শীত এখনো তীব্র না হতেই কোনো কোনো হাসপাতালে রোগী বাড়তে শুরু করেছে। ওই হাসপাতালগুলোতে একাধারে ফুসফুসের রোগী ও করোনায় আক্রান্তদেরও চিকিৎসা চলছে। কোথাও বা এ ধরনের রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ চাইল্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহা বলেন, দেশে নিউমোনিয়া আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ শতাংশের অজানা নিউমোনিয়া থাকে, যেগুলোর কারণ খুঁজে বের করতে পারলে অনেক উপকার হবে, মৃত্যু রোধ করা যাবে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার করোনা সংক্রমণের মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ফুসফুসের সংক্রমণ রোধ করতে পারা। কারণ আমরা গরম ও বর্ষা মৌসুম পার করেছি করোনা নিয়ে, কিন্তু শীতের পরিস্থিতি বুঝতে পারছি না এখনো। ফলে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ভ্যাকসিনের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি, কিন্তু ভ্যাকসিন আসুক বা না আসুক, আমাদের সবার জন্য সব সময়ে বড় রক্ষাকবচ হয়ে থাকবে মাস্ক। কারণ আমরা দেখছি, অনেক ভাইরাসপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন বের হওয়ার পরও রোগগুলো নির্মূল হয়নি, এখনো রয়ে গেছে।’

রাজধানীর শ্যামলী ২৫০ শয্যা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. আবু রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছর শীতে দেশে ফুসফুসের সংক্রমণের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি রাখি। এবারও আমরা বাড়তি প্রস্তুতি রেখেছি। যদিও জনবলসংকটের কারণে রোগীর সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে, আউটডোরে রোগী দেখার জন্য পদ থাকা সাতজন জুনিয়র কনসালট্যান্টের একজনও নেই। এখন রোগীর চাপ বেশি থাকায় আমরা মাত্র তিনজন প্রতিদিন আউটডোরে রোগী দেখছি। অন্যদিকে ইনডোরে সাধারণ রোগীদের মধ্য থেকে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়। তাদেরও এখানেই সেবা দিচ্ছি।’

এই হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা রোগীদের পাশাপাশি করোনা রোগীদেরও সেবা দিচ্ছি।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাকিল আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় শিশুরা তুলনামূলক নিরাপদ হলেও ফুসফুসের সংক্রমণের শিকার শিশুরা করোনায় আক্রান্ত হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে করোনায় বিপদ থেকে শিশুদের বাঁচাতে হলে তাদেরও সুরক্ষায় নজর রাখতে হবে পরিবারের অন্যদের। সেই সঙ্গে এখন আবার সময় এসেছে ছোট-বড় সবার যতটা সম্ভব ঘরে থাকার। যদি বের হতেই হয় তবে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়াসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেননুর বলেন, ‘আমাদের দেশে অ্যাজমা রোগীর সংখ্যা এখন এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আর এই রোগীরাই শীতের সময় বেশি জটিলতায় পড়ে। তাদের অনেকেই কিছুদিন ওষুধ ব্যবহারের পর একটু ভালো হলেই ওষুধ ছেড়ে দেয়, কিন্তু অ্যাজমা তাদের ছেড়ে যায় না। এই করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা লোকদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অ্যাজমায় আক্রান্তরা। এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সতর্কতা। আগের সমস্যা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে চললে ঝুঁকি কম থাকবে।’

এই বিশেষজ্ঞ সংকটময় এই সময়ে সবাইকে ফুসফুসের সুরক্ষার জন্য নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন দিয়ে রাখার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে ছোটদের ও বড়দের আলাদা ভ্যাকসিন রয়েছে। আগে বড়দের ভ্যাকসিন দেশে সহজলভ্য না থাকলেও এখন তা সব জায়গায়ই পাওয়া যায়। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুরক্ষায় কিছু ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, তা দিয়ে রাখলে বয়স্কদের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে বলেও ওই বিশেষজ্ঞ জানান।

এদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘করোনা ছাড়াও শীতকালীন আরো দুটি রোগ আমাদের দেশে খুবই বিপদ ডেকে আনে। একটি হচ্ছে নিপাহ ভাইরাস ও আরেকটি রোটা ভাইরাস। নিপাহ ভাইরাসে ছোট-বড় যে কেউ খেজুরের কাঁচা রসের মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। কারণ বাদুড়ের মাধ্যমে রসের মধ্যে ওই ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুহার অন্য যেকোনো ভাইরাসের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে দেশে শীতকালীন ডায়রিয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে রোটা ভাইরাস। শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হয়। আর করোনায় আক্রান্ত হলেও ডায়রিয়া অন্যতম উপসর্গ। ফলে এক ধরনের জটিলতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এবার শীতে সবাইকে অধিকতর সতর্ক থাকতে হবে।’

 

মন্তব্য