kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

অভয়ারণ্যে অশনিসংকেত

► হাতির বিচরণক্ষেত্র নষ্ট
► হত্যায় মেতেছে মানুষ

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অভয়ারণ্যে অশনিসংকেত

হাতি হত্যার পর দৌড়ঝাঁপ শুরু করে প্রশাসনের লোকজন। সৎকার হয় হাতির দেহের। উদ্ধার হয় বিদ্যুতের তার, বল্লম। দুদিন পরই সব তৎপরতা থেমে যায়। আবারও খবর মেলে গুলিতে হাতির মৃত্যুর। লোহাগাড়ার গহিন বন থেকে তোলা ছবি। ছবি : সংগৃহীত

গত ১৬ বছরে মানুষের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে ১১২টি হাতি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে হত্যা করা হয়েছে ১৩টিকে; যেখানে আটটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ও পাঁচটিকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আর চলতি মাসের ৬ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত ১৭ দিনে চারটি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনে এই হাতি হত্যাযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়েছে বন বিভাগ।

বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও বন বিভাগের কর্মকর্তা বলছেন, হাতি যেসব এলাকায় অবাধে বিচরণ করত, সেসব ক্ষেত্রগুলো দ্রুত কমে আসছে। বনে মানুষের বসতি বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে হাতি চলাচলের অনেক করিডর এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য নিয়মিত চলাচলের পথ ব্যবহার করতে পারছে না হাতি। অনেকটা বাধ্য হয়েই মানুষের বসতি এলাকা দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছে প্রাণীটি। এতে মানুষও আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর রক্ষা বা জমির ফসল রক্ষার উদ্দেশ্যে হাতির ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করছে। কখনো গহিন অরণ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে, কখনো বা গুলি করে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে। আবার কিছু অসাধু চক্রও হাতির দাঁতের লোভে প্রাণীটিকে হত্যা করছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ও বন বিভাগের তথ্য মতে, গত ৬ নভেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ার খুটাকালীর বনে একটি বাচ্চা হাতি, ১৪ ও ১৫ নভেম্বর রামুর জোয়ারিয়ানালা ও দক্ষিণ মিঠাছড়িতে দুটি হাতি এবং ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার গহিন বনে আরো একটি হাতিকে গুলি করে ও বৈদ্যুতিক ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে গত ২৯ মার্চ, ২২ মে এবং ৪ ও ২৯ জুন বাঁশখালীতে হত্যা করা হয়েছে চারটি হাতি। এসব ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে ৩৬টি মামলা করা হলেও হাতি হত্যা থামেনি। অভিযোগ রয়েছে, হাতি হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ খুব একটা উৎসাহ দেখায় না।

হাতি হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আ ন ম ইয়াছিন নেওয়াজ। গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বনাঞ্চল দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন যাবে কেন? কেনই বা হাতি মারতে বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ ব্যবহার করা হবে এবং হাতি হত্যাকারীরা অস্ত্র-গুলি পাচ্ছে কোথায়? এসব অবৈধ অস্ত্র-গুলি উদ্ধার কেন হচ্ছে না? এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। বনে মানুষের বসতি বাড়াতে গিয়ে হাতি হত্যা করা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে আবাসিক হাতি আছে ২৬৮টি। এর বাইরে পাশের দেশ থেকে আরো কয়েকটি হাতি আসে, আবার ফিরেও যায়। এসব হাতিসহ ৩২০-৩৩০টি হাতি আছে দেশে। এখন হত্যাযজ্ঞের কারণে হাতির সংখ্যা দ্রুত কমছে।

দেশে হাতির স্থায়ী আবাসস্থল বলা হয়, পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজার জেলার ফাঁসিয়াখালী, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ বনকে। এখন কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বনে চলছে হাতি হত্যাযজ্ঞ। এ যেন নিজ রাজ্যেই পরবাসী হাতির দল। প্রতিবছরই এই দুই জেলার বনে সর্বাধিক হাতি হত্যা শিকার হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে বনে অন্তত ১১২টি হাতির মৃত্যুর তথ্য আছে বন বিভাগের কাছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ হাতি গুলি করে ও বৈদ্যুতিক ফাঁদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মারা গেছে ৫২টি হাতি। এর মধ্যে বার্ধক্যজনিত ও রোগাক্রান্ত হয়ে ২৬টি, পাহাড় থেকে পড়ে দুর্ঘটনায় আটটি, পার্বত্য এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে দুটি এবং পানিতে ডুবে দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে। বাকি ১৩টি হাতি হত্যা করা হয়েছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ও গুলি করে।

বন্য প্রাণীর আক্রমণে কারো মৃত্যু হলে তার পরিবার পাচ্ছে এক লাখ টাকা; পঙ্গু বা আহত হলে ৫০ হাজার এবং বাড়িঘর-ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। এর পরও এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত হাতি হত্যা করছে। আর হত্যাকাণ্ডে বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহারের প্রমাণ সরেজমিনে গিয়ে পেয়েছেন বন কর্মকর্তারা।

এর মধ্যে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ক্ষতিগ্রস্ত ৮৫ জনের মধ্যে ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৮০ জনকে ৫৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই বছরে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া ৪৭ জনের পরিবারও রয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ তিন গুণ বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়া চলছে।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গ্রহণের সময় বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ বলছেন, কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের বন উজাড় করে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল, রামুর বনে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, চুনতি অভয়ারণ্য ধ্বংস করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ এবং সাতকানিয়ার বায়তুল ইজ্জত এলাকায় সরকারি স্থাপনা গড়ে তোলা—এসব কারণে বনভূমিতে হাতির চলাচলের পথ কমে গেছে। খাদ্যসংকটে পড়ছে হাতি। তাই খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে এসে মারা পড়ছে। 

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, সেগুলো গ্রহণের আগে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ কিংবা বন বিভাগের মতামতকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বন বিভাগকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মেগা প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। পরে সেগুলো বাস্তবায়িতও হচ্ছে। এসব কারণে বন্য প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে আ ন ম ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, ‘সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার দরকার আছে। দেশের স্বার্থেই এসব হচ্ছে। তবে রেললাইন নির্মাণের সময় চাইলে বনের ক্ষতি আরো কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া যেত।’

একই বিষয়ে চুনতি অভয়ারণ্যের রেঞ্জার মো. মনজুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মিত হচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্যের ওপর দিয়ে। এই অভয়ারণ্যে তিনটি হাতির করিডর রয়েছে। এই তিনটি করিডরের ওপর দিয়েই রেললাইন নির্মিত হচ্ছে। রেললাইন নির্মাণকাজ শুরুর আগে প্রতিনিয়ত হাতির বিচরণ দেখা যেত আমার অফিসের আশপাশেই। এখন আর হাতির আনাগোনা আমার অফিসের আশপাশে নেই বললেই চলে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বায়তুল ইজ্জত, লোহাগাড়ার চুনতি অভয়ারণ্য, বান্দরবানের লামা-আলীকদম এবং কক্সবাজারের উখিয়া এলাকায় হাতির করিডর রয়েছে। কিন্তু সব এলাকাতেই সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং হচ্ছে। এ ছাড়া উখিয়ায় রোহিঙ্গারা অবস্থান নিয়েছে। এই কারণে হাতির সমস্যা হচ্ছে।

হাতির সংখ্যা নিরূপণের প্রথম তথ্য পাওয়া যায় ১৯৮০ সালে। ড. রেজা খানের জরিপ অনুযায়ী হাতি ছিল ৩৮০টি। আবার ২০০০ সালে ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের গবেষণা অনুযায়ী হাতি ছিল ২৩৯টি। ২০০৪ সালে আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী হাতির সংখ্যা ২২৭টি।

বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, হাতির দল লোকালয়ে চলে এলে তাদের বনে ফিরিয়ে নিতে একদল গ্রামবাসীকে প্রশিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। এই গ্রুপটি বলা হচ্ছে এলিফ্যান্ট রেন্সপন্স টিম (ইআরটি)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির সুরক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দরকার। তাদের বসতি ও বিচরণ এলাকা রক্ষা করতে হবে; যাতে হাতি নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রাণী রক্ষায় সচেতন করতে হবে। হাতি হত্যায় দায়ীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং বন বিভাগের কর্মীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা