kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কালের কণ্ঠ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউএসএইডের গোলটেবিল

যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক বিপদ ঘটাতে পারে

ওষুধের মানের ব্যাপারে আপস নেই : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক বিপদ ঘটাতে পারে

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের সম্মেলনকক্ষে গতকাল কালের কণ্ঠ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউএসএইড আয়োজিত ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ও করণীয়’ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনা ঘিরে দেশের মানুষ যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে তা সামনে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে পরে অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তখন প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সংশ্লিষ্ট রোগীর শরীরে কার্যকর না-ও হতে পারে। বিশ্বের কোথাও প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কেনাবেচা সম্ভব নয়, শুধু বাংলাদেশেই এটা সম্ভব। যে কেউ যখন-তখন ওষুধের দোকানে গিয়ে যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারছে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। এ কারণেই ভয়াবহ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ফলে এ ব্যাপারে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউএসএইড আয়োজিত যৌথ গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি বলেন, ওষুধের মানের ব্যাপারে কোনো আপস নেই। নিম্নমান, নকল, ভেজাল ও অবৈধ ওষুধ উৎপাদন এবং বাজারজাতের বিরুদ্ধে অভিযান ও বিধিগত ব্যবস্থা চলবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার মানুষকে বিপদগ্রস্ত করছে; কিন্তু মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন নয়। অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ কিনে খাচ্ছে, যাতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবাইকে আরো সতর্ক হতে হবে। এখন অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে, কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসংক্রান্ত বৈশ্বিক সংস্থার কো-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, যা দেশের জন্য বড় গর্বের ব্যাপার।’

মন্ত্রী বলেন, ‘দেশে ওষুধ নিয়ে গবেষণার মাত্রা আরো বাড়াতে হবে। গবেষণা খুবই কম হচ্ছে। ওষুধ উৎপাদনে যত বেশি আমরা এগিয়ে যাচ্ছি—সেদিক থেকে মান ও দামের ক্ষেত্রে নজর কিছুটা কম। অনেকেই দামের কারণে অ্যান্টিবায়োটিকের সব ডোজ পূরণ করতে পারে না।’

রাজধানীতে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের সম্মেলনকক্ষে আয়েজিত ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ও করণীয়’ বিষয়ে এই গোলটেবিল আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ও এর পরিণতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যেসব তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরছেন তা রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। আমরা গণমাধ্যম হিসেবে এ বিষয়েই মানুষকে সচেতন করতে চাই। কিন্তু ভয় পেয়ে অন্ধকারে পড়ে থাকলে হবে না, আমাদের আলোর পথ খুঁজতে হবে, লড়াই করতে হবে।

নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিরাপদভাবে বাঁচতে হবে। সতর্কতার মাধ্যমেই এটা সম্ভব হবে। অর্থাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না, আবার চিকিৎসকরাও যেন অপ্রয়োজনে বা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক না দেন, সেই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের গুণগত মান ঠিক আছে কি না সেটাও দেখতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে—তবেই আমাদের বিপদের মাত্রা কমে যাবে।’

ওয়ান হেলথ কার্যক্রমের বাংলাদেশে সমন্বয়কারী এবং চট্টগ্রাম ভেটেরেনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্স হাসপাতালের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিতীশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্য—উভয় ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বিপদের মুখে পড়েছে। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে আমাদের ওয়ান হেলথ কনসেপ্টকে কার্যকর করতে হবে। সমন্বিতভাবে জনস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য, কৃষি—সব ক্ষেত্রে ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে হবে, সচেতন করতে হবে।’

মূল প্রবন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, ‘শুধু মানুষ যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে তা-ই নয়, আমাদের মাটি, পানি ও প্রাণিসম্পদও নানাভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের দূষণে বিষাক্ত হচ্ছে। ফলে মানুষের বিপদ ঘটছে। অনেক মানুষ এখন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই তাদের শরীরে আর কাজ করছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গ নয়, ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক বাজেট নেই, জনবল নেই।’

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাথু রাম সরকার বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণিসম্পদে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়ে থাকে। বিভিন্ন মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণীর শরীরে ঢুকছে, তা আবার প্রাণিজ খাদ্য হিসেবে ঢুকছে মানুষের শরীরে।

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘করোনা আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে আরেক ধাপ বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ করোনা থেকে মুক্তির আশায় যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েছে। তাদের শরীরে এর প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে কী হবে না হবে তা বড়ই আশঙ্কার বিষয়।’

বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘আমরা ডাক্তাররাও যথেচ্ছভাবে ওষুধ দিচ্ছি। আবার সব মানুষই নিজেদের মতো ডাক্তারি করছে। কোনো দিকেই সচেতনতা নেই, তদারকি নেই, গবেষণার ব্যবস্থা নেই, ওষুধগুলোর মান আছে কি না আছে তার পরীক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে বিপদ তো আমাদের আছেই।’

গোলটেবিলের সহ-আয়োজক হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছি। বিভিন্ন পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেগুলো মাঠপর্যায়েও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে।’

আরেক সহ-আয়োজক ইউএসএইডের এমটিএপিএস কার্যক্রমের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. জেবুন্নেসা রহমান বলেন, ইউএসএইড বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ অন্যদের নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিরোধ এবং এ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন সহায়ক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এএমআর কার্যক্রমের ফোকাল ডা. রামজি ইসমাইল, ইউএসএইডের গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট ডা. আবুল কালাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসির উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. অনিন্দ রহমান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা