kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন বাদল রায়

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন বাদল রায়

মৃত্যুর দুয়ার থেকে একবার ফিরে এসেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তখন থেকে মা ডাকতেন, তাঁর চিকিৎসার সব রকম ব্যবস্থা করেছিলেন বলে, কিন্তু শরীরে যে কোপ বসিয়ে গিয়েছিল যমদূত। তা নিয়ে চলতে বাদল রায়কে আরো কত না লড়াই করতে হয়েছিল, কিন্তু বাইরে বোঝাননি কখনো। আবারও ফুটবল নিয়ে সরব হয়েছেন। দীর্ঘ খেলোয়াড়িজীবন শেষে, সংগঠক ক্যারিয়ারও কম দিনের নয়। বাদল রায় আমৃত্যু ফুটবলের মানুষ হয়েই ছিলেন। হ্যাঁ, ছিলেন আজ নেই, এই মায়ার ভুবন ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।

করোনা তাঁকে হারাতে পারেনি। অসুস্থ হয়ে আইসিইউ থেকে আবার ঘরে ফিরেছিলেন, কিন্তু কিছুদিন আগে কিডনি জটিলতায় আবার হাসপাতালের বিছানায়। এবার অবস্থা অবনতির দিকে। নিয়মিত ডায়ালিসিসের প্রয়োজন পড়ল। এর মধ্যেই জানা গেল লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। স্কয়ার হাসপাতাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় তাঁকে, সেখান ডায়ালিসিস বন্ধ থাকায় গত পরশু নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ মেডিক্যালে। কাল সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন মোহামেডানের বাদল, জাতীয় দলের বাদল, সবার প্রিয় বাদলদা। সর্বশেষ বাফুফে নির্বাচনেও ফুটবল সমর্থকদের একটা বড় অংশ তাঁর পেছনে একাট্টা হয়েছিল। ২০১৭-এর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার পর তিনি আবার ফুটবলের হাল ধরতে পারবেন, এই বিশ্বাসটা অবশ্য পরিবারের মধ্যেই ছিল না। যে কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে নির্বাচন করতে দেননি স্ত্রী মাধুরী রায়। কিন্তু স্বামীকে আর আগলে রাখতে পারলেন কই! সেই মৃত্যু এসে সব বন্ধন টুটিয়ে দিয়ে তাঁকে নিয়ে গেল। যেখানে মোহামেডান নেই, নেই ফুটবল ফেডারেশন, অবারিত সবুজ মাঠ...নাকি আছে!

কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে থাকতে ফুটবল নিয়ে পুরো মেতে উঠেছিলেন বাদল। কুমিল্লা লীগে খেলেই নজরে পড়েছিলেন মোহামেডানের কর্মকর্তাদের। ’৭৭ সেই যে সাদাকালোর আঙিনায় পা রেখেছিলেন আর কোথাওই যাননি তিনি। ভরা সময়ে আবাহনীর প্রস্তাব পেয়েছিলেন, কিন্তু বাদল মোহামেডানের হয়েই ছিলেন। আবাহনীর হ্যাটট্রিক শিরোপার বদলা নিয়েছিলেন নিজেরা হ্যাটট্রিক করে। ১২ বছরের ক্যারিয়ারে জেতেন ছয় শিরোপা। ’৮২-তে কাজী সালাউদ্দিনের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে ২৭ গোলের নতুন রেকর্ড গড়েন (যা আজও টিকে আছে) আব্দুস সালাম মুর্শেদী। কে না জানে সেই সব গোলের  বেশির ভাগে অবদান ছিল বাদল রায়ের। স্ট্রাইকারের একটু পেছনে খেলতেন, গোল করতেন, করাতেন, খেলা তৈরি করতে পছন্দ করতেন। ১৯৮০ সালে জাতীয় দলে অভিষেক, ১৯৮২ এশিয়ান গেমসেই মালয়েশিয়াবধে তাঁর গোল ছিল। ফুটবলই ছিল বাদলের ধ্যান-জ্ঞান। কালের কণ্ঠে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘জীবনে না চাইতেই অনেক কিছু পেয়েছি আমি, তার সবই ফুটবলের জন্য।’ সেই ফুটবলধ্যানীকে হারিয়ে গোটা ক্রীড়াঙ্গন কাল থেকে শোকের চাদর গায়ে জড়িয়েছে। কাল বাদল রায়ের মৃত্যুর খবর আর সব কিছুকে তুচ্ছ বানিয়ে দিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে। ফেসবুকের ওয়াল ভরে গেছে তাঁর ছবি আর শোকবার্তায়। প্রধানমন্ত্রী শোক জানিয়েছেন। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রইসউদ্দিনসহ ক্রীড়াঙ্গনের সর্বস্তরের মানুষ শোকে মুহ্যমান। বাদল রায়ের সতীর্থরা কাল স্মৃতিচারণারও ভাষা হারিয়েছিলেন। আব্দুল গাফ্ফার বলছিলেন, ‘বাদল যে আমাদের কাছে কী ছিল, তা বলে বোঝাতে পারব না। ওর চলে যাওয়ায় জীবনের একটা অংশই যেন আমি হারিয়ে ফেলেছি।’ বাদলের মৃত্যুর খবর শুনেই কাল হাসপাতালের পথে ছুটছিলেন আরেক সাবেক ফুটবলার হাসানুজ্জামান বাবলু, কান্নার তোড়ে কথা লুকাতে হয়েছে তাঁকে।

মোহামেডানে খেলা শেষ করে দলের ম্যানেজার হয়েছিলেন, পরে হন ক্লাবের পরিচালক। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ছিলেন। টানা তিনবারের সহসভাপতি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের। বাদল রায়ের দেওয়ার ছিল আরো অনেক। কিন্তু অদৃষ্টের ইশারায় ৬২ বছর বয়সেই থেমেছে তাঁর জীবনঘড়ি। তাঁর স্মৃতি সজীব থাকবে এ দেশের ফুটবল ইতিহাসে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা