kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

আলোকিত মানুষ

রফিক-উল হকের ‘সুবর্ণ’

এম বদি-উজ-জামান, বাহরাম খান ও শরীফ আহ্‌মেদ শামীম   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রফিক-উল হকের ‘সুবর্ণ’

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের অর্থায়নে পরিচালিত সেই ‘সুবর্ণ ক্লিনিক’ এখন ডা. ফরিদা হক মেমোরিয়াল-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল (ওপরে); ঢাকা শিশু হাসপাতাল নির্মাণে তাঁর অবদান থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কোথাও স্বীকৃতির উল্লেখ নেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভারতের কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রাম। ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর সেই গ্রামেই তাঁর প্রথম পৃথিবীর আলো দেখা। এরপর ধীরে ধীরে শৈশব, কৈশোর পাড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনটাও কলকাতার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা। তারপর বার-এট-ল করতে পাড়ি জমালেন বিলেতে (যুক্তরাজ্য)। কৃতিত্বের সঙ্গে ওই ডিগ্রি নিলেন বটে, তবে ভারত হারায় শিশু থেকে বড় হয়ে ওঠা কীর্তিমান মানুষটিকে। ভারত ছেড়ে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে ১৯৬২ সালে চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে। কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামের সেই ছোট শিশুটি আর কেউ নন, তিনি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক; যাঁকে বাংলাদেশের মানুষ চেনে একজন মানবদরদি আইনজীবী হিসেবে।

তিনি ছিলেন এক অনন্য সমাজসেবী। বারডেম, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, গাজীপুরের ১০০ শয্যার সুবর্ণ হাসপাতালসহ ২৫টির বেশি হাসপাতাল, এতিমখানা, মসজিদ ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠায় যাঁর ছিল অনন্য অবদান। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই হাত বাড়িয়েছেন মানবতার সেবায়। যে মানুষটি সারা জীবনের অর্জিত কোটি কোটি টাকা বিলিয়েছেন অকাতরে, সেই মানুষটিকেই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মনে রাখেনি।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক নিজ জন্মভূমি ছেড়ে এলেও কোনো দিনই তাকে ভোলেননি। তাই তো তিনি বাংলাদেশের বুকে এঁকে গেছেন আরেক ‘সুবর্ণপুর’। বাংলাদেশে তাঁর টাকায় প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির নামকরণ করেছেন নিজ গ্রামের নামে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর উপার্জিত টাকায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে, কোনোটাই নিজের নামে রাখেননি। মৃত্যুর সময় তিনি নিজের নামে কোনো সম্পদও রেখে যাননি। ঢাকার পল্টনে এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বাড়িটি ছাড়া সব কিছুই বিভিন্ন সংস্থায় দান করে গেছেন। ওই দুটি বাড়ি নিজের স্ত্রীর নামে করা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পল্টনে যে বাড়িটিতে তিনি বাস করতেন, সেই বাড়ির জমি কেনা হয় তাঁর স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের নামে। এই বাড়ির নাম দেন ‘সুবর্ণা’। নিজের জন্মভূমিকে স্মরণে রাখতেই এই উদ্যোগ। এর প্রমাণ মেলে তাঁর করা গাজীপুরের চন্দ্রায় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের নাম দেখে। ওই হাসপাতালটির নাম রাখা হয় ‘সুবর্ণ ক্লিনিক’। পরবর্তী সময়ে সেটির নাম ডা. ফরিদা হক মেমোরিয়াল-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল করা হলেও গাজীপুরের মানুষ এখনো ‘সুবর্ণ ক্লিনিক’ হিসেবেই চেনে। 

নবীনগর-চন্দ্রা সড়কটি নির্মিত হয় ১৯৬৬-১৯৬৭ সালের দিকে। ওই সময় সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সালেক হোসেন ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সড়কের কাজ দেখতে আসার সময় সালেক হোসেনের সঙ্গে প্রায়ই চন্দ্রা আসতেন রফিক-উল হক। ওই সময় চন্দ্রা ছিল বনাঞ্চলঘেরা অবহেলিত জনপদ। ১৯৬৭ সালে বন্ধু সালেক হোসেন চন্দ্রা মোড়ে রফিক-উল হকের জন্য প্রায় তিন একর জমি পছন্দ করেন। পরবর্তী সময়ে স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের নামে জমিটি কেনেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। পরে ওই জমিতে এলাকার মানুষের সুবিধার জন্য তিনি বিশাল মসজিদ, হাসপাতাল ও বাগানবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

ডা. ফরিদা হক মেমোরিয়াল-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল : ১৯৯৫ সালে নিজ গ্রামের নামানুসারে কালিয়াকৈরের মানুষের সহজ ও স্বল্প খরচে চিকিৎসার কথা ভেবে চন্দ্রায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুবর্ণ ক্লিনিক’। শুরুতে এখানে শিশু ও মাতৃকল্যাণ চিকিৎসা দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে প্রায় ১৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার ইব্রাহিম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সঙ্গে পরিচালনায় যুক্ত হয়। নাম দেওয়া হয় ডা. ফরিদা হক মেমোরিয়াল-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল। ১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে জরুরি বিভাগ, ডায়াবেটিক, আউটডোর-ইনডোর সেবা, অপারেশন থিয়েটারসহ সব ধরনের সেবা চালু রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দেড় শর বেশি রোগী আউটডোরে সেবা নেয়। খরচ অন্য হাসপাতালের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম।

সুবর্ণ জামে মসজিদ : এলাকাবাসী ও পথচারীদের নামাজের সুবিধার্থে ১৯৯০ সালে চন্দ্রায় ওই জমির কিছু অংশে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুবর্ণ জামে মসজিদ’।  মসজিদের পাশে নির্মাণ করেন মার্কেট। মার্কেটের দোকান ভাড়ার আয় দিয়ে চলে ইমাম, মোয়াজ্জিন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। তিন-চার বছর আগে সড়কটি বড় করার সময় মসজিদ ও মার্কেট ভাঙা পড়ে। পরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় পাশের সরকারি জায়গায় মসজিদটি স্থানান্তর করে।

মসজিদের সাধারণ সম্পাদক কালিয়াকৈরের চন্দ্রার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্যার ছিলেন মসজিদের সভাপতি। মসজিদ ছাড়াও তিনি নিজ জমিতে হাসপাতালের পাশে একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। ওই বাগানবাড়িতে রয়েছে বিভিন্ন জাতের ফলদ ও বনজ গাছ। সুস্থ থাকাকালে স্যার প্রতি শুক্রবার দেশের খ্যাতনামা আইনজীবী ও চিকিৎসকদের নিয়ে বাগানবাড়িতে আসতেন। আসতেন স্যারের পরিবারের সদস্যরাও। এ ছাড়া স্যার চন্দ্রার জাতির পিতা কলেজ, জাতির পিতা স্কুল ও মাহমুমদপুর মাদরাসার আজীবন দাতা ছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও তিনি এলাকার বহু প্রতিষ্ঠানে প্রচুর টাকা দান করেছেন। আনোয়ার হোসেন আরো বলেন, স্যার কালিয়াকৈরের মানুষকে ভালোবাসতেন। কালিয়াকৈরকে মনে করতেন নিজের সুবর্ণগ্রাম।

বারডেম হাসপাতাল : বারডেমে তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর নামে আন্তর্জাতিক মানের একটি ল্যাবরেটরি করা হয়েছে। ল্যাবরেটরি বাবদ যা খরচ হয় তা ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছিলেন রফিক-উল হক। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক দানবীর হিসেবে নিজের সম্পদ যেভাবে মানুষের কল্যাণে দিয়েছেন, তা সত্যিই উল্লেখ করার মতো। তিনি ছিলেন বারডেম হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। ডায়াবেটিক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। বারডেম হাসপাতালে তাঁর স্ত্রী ও শাশুড়ির নামে দুটি ওয়ার্ড আছে। যেগুলো তিনি নিজে টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ঢাকা শিশু হাসপাতাল : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ঢাকা শিশু হাসপাতালের জন্য জমির বরাদ্দ করিয়ে নেন। ১৯৭৪ সালে আড়াই শ বেড়ের শিশু হাসপাতাল করার জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়। পরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গেও ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সখ্য গড়ে ওঠে। এ কারণে জিয়াউর রহমান তাঁকে দিয়ে অনেক আইন প্রণয়নের কাজ করিয়ে নিতেন। কিন্তু কোনো দিনই পারিশ্রমিক নেননি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। জীবিতকালে দেওয়া রফিক-উল হকের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, জিয়া একদিন তাঁকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে কিছু করতে বলেছিলেন। সেই টাকা রফিক-উল হক দিয়েছিলেন ঢাকা শিশু হাসপাতালে। অধ্যাপক ডা. তোফায়েল আহমেদ, ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ কয়েকজন ব্যক্তির উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ঢাকা শিশু হাসপাতাল। কিন্তু এই হাসপাতালের কোথাও রফিক-উল হকের অবদানের কোনো চিহ্ন নেই।

এ ব্যাপারে ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, এই হাসপাতালটি এখন সরকার গঠিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার জন্য বড় ভূমিকা ছিল অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ও ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একসময় এই হাসপাতালটির সেক্রেটারি ছিলেন, ছিলেন ট্রাস্টিও। কিন্তু তাঁর অবদানের কোনো চিহ্ন এখন হাসপাতালে নেই। এর অন্যতম কারণ দুটি। একটি তিনি নিজেই চাইতেন না তাঁর নাম থাকুক। দান করে নিজের নাম প্রচারের পক্ষে ছিলেন না তিনি। আরেকটি বিষয় হলো, এই হাসপাতাল পরিচালনায় যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা রফিক-উল হককে যথাযথ মূল্যায়ন করেননি। এটা নিয়ে তাঁর আক্ষেপও ছিল।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা