kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

আলুর দাম কমছে

সময়মতো নতুন আলু উঠবে কি না চিন্তিত কৃষক-ভোক্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আলুর দাম কমছে

নতুন দাম বেঁধে দেওয়ার তিন দিন পর কমতে শুরু করেছে আলুর দাম। হিমাগার, পাইকারিতে দাম কিছুটা কমেছে। তবে খুচরা পর্যায়ে কোনো কোনো বাজারে দাম কেজিতে পাঁচ থেকে সাত টাকা কমলেও কোথাও রয়েছে আগের বাড়তি দাম। বিক্রেতারা বলছেন, হিমাগার থেকে দাম কমিয়ে বিক্রি করা আলু বাজারে পুরোদমে এলে সব জায়গায় দাম কমে আসবে। তবে বাজারে নতুন আলু না আসা পর্যন্ত আলুর দামে স্থিরতা আসবে না। তবে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে নতুন আলু সময়মতো তুলতে পারবেন কি না তা নিয়ে কোনো কোনো অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা শঙ্কায় রয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জের হিমাগারগুলোতে গত বুধবার থেকে প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২০০ টাকা বা ২৪ টাকা কেজি দরে। রংপুরে হিমাগার পর্যায়ে প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ টাকার ওপরে। অর্থাৎ প্রতি কেজি আলুর দাম পড়ে প্রায় ৩০ টাকা। গতকাল ঢাকার বাজারগুলোতে পাইকারিতে আলু বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি, আর খুচরায় ৪৫ টাকা পর্যন্ত রাখছেন বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ নতুন আলু বাজারে আসতে থাকে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাজারে পুরোদমে নতুন আলু পাওয়া যায়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কৃষকরা ঘরেই আলু সংরক্ষণ করেন। মার্চ মাসে হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষণের পর সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস পর্যন্ত হিমাগার থেকে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী তাঁদের আলু বিক্রি করে থাকেন। এর মধ্যে বীজ আলু নিয়ে আবার রোপণও শুরু করেন। ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এই দুই মাস বাজারে আলুর কিছুটা ঘাটতি হয় এবং দাম বাড়ে। তবে এর আগে দাম ৩০ টাকার ওপরে যায়নি।

কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন। অক্টোবর মাস প্রায় শেষ হয়ে আসছে, কিন্তু কয়েক দফা বন্যা আর অতিবৃষ্টিতে সময়মতো আলুর বীজ রোপণ করতে পারেনি অনেক অঞ্চলের কৃষক। উঁচু জায়গার যেখানে রোপণ হয়েছিল সেগুলোরও অনেক নষ্ট হয়েছে। তবে কিছু কিছু অঞ্চল বা জমিতে ফলন হচ্ছে। কোথাও নতুন করে রোপণ করা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ফলন হওয়া আলু উঠাতে আরো এক থেকে দেড় মাস লাগবে, যা পুরো দেশের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত নয়। আর পুরোদমে নতুন আলু বাজারে আসতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস লাগবে। এ অবস্থায় কৃষক বীজ আলু হিমাগার থেকে তুলে নিলে বাকি আলু দিয়ে তিন থেকে চার মাস চলবে কি না—এ নিয়ে চিন্তিত কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৯ লাখ টন আলু। দেশে পুরো বছরের চাহিদা ৭০ লাখ টন। অর্থাৎ প্রতি মাসে পাঁচ লাখ ৮৩ হাজার টন। গত মৌসুম শেষে মার্চ মাসে হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩০ লাখ টন। এর মধ্যে বীজ আলুর হিসাবে রয়েছে ১০ লাখ টন। অবশিষ্ট আলু কৃষক গৃহপর্যায়ে তিন থেকে চার মাস সংরক্ষণ করেন। সে হিসাবে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত খাওয়ার জন্য থাকে ২০ লাখ টন।

তবে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে চাহিদা আরো বেশি, ৯০ থেকে ৯৫ লাখ টন। তাদের হিসাবে ৮৫ হাজার টন উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল ৪০ লাখ টন। এখন পর্যন্ত ২২ লাখ টনের বেশি বিক্রি হয়েছে। বাকি ১৮ লাখ থেকে ১০ লাখ বীজ আলু রেখে খাওয়ার মতো রয়েছে আট লাখ টন, যা আগামী মাসগুলোর জন্য পর্যাপ্ত নয়।

জয়পুরহাটের হিমাগার মালিকরা গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, বর্তমানে জেলার প্রতিটি হিমাগারেই সংরক্ষণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আলু চাহিদার ভিত্তিতে কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা ভাড়া পরিশোধ করে হিমাগার থেকে নিয়ে গেছেন। বর্তমানে হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর বেশির ভাগই বীজ। আর বিক্রির জন্য যে আলু মজুদ রয়েছে তার পরিমাণ আড়াই লাখ বস্তা (৬০ কেজি হিসাবে) বা তিন লাখ ৭৫ হাজার কেজি।

মুন্সীগঞ্জ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, চার দফা বন্যায় ও বৃষ্টির কারণে মুন্সীগঞ্জের আলুর জমিগুলো থেকে এখনো পানি সরে না যাওয়ায় কৃষক আলু চাষাবাদ শুরু করতে পারেননি। ঠিক এই সময়টাই উঁচু জমিতে এই অঞ্চলে আলু রোপণের মৌসুম। আর নভেম্বরের প্রথম দিকে নিচু জমিতে আলু চাষাবাদ শুরু হলেও নভেম্বরের মাঝামাঝি ছাড়া এখানে আলু চাষাবাদ সম্ভব নয়। তবে এ বছর মুন্সীগঞ্জে আলু চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে জেলা কৃষি বিভাগ বলছে।

রংপুর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, টানা বর্ষণ-বন্যার কারণে প্রতিকূলতায় এ বছর রংপুর অঞ্চলে আগাম আলু চাষও পিছিয়ে পড়েছে। বৃষ্টিতে রোপণ করা আলু পচে নষ্ট হওয়ায় নতুন করে ওই জমিতে আলু লাগানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। তাঁরা জানান, আগাম আলু চাষের এলাকা তিস্তার চরাঞ্চলসহ নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের নতুন আলু এত দিন বাজারে উঠত। স্বল্পমেয়াদি জাতের আমন ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই ওই জমিতে আগাম আলু চাষ করেছিলেন তাঁরা। বর্ষণ-বন্যায় ক্ষেতে রোপণ করা আলু পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এ বছর আগাম আলু বাজারে আসতে আরো মাস খানেক সময় লাগবে।

বর্তমানে কৃষকপর্যায়ে আলুর মজুদ নেই। হিমাগারে রক্ষিত আলুর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই উত্তোলন করা হয়ে গেছে। যেটুকু হিমাগারে রয়েছে, তার বেশির ভাগই বীজ আলু, যা কৃষকরা চলতি মৌসুমে জমিতে করবেন। প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মো. মাসুদ খান, রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক স্বপন চৌধুরী ও জয়পুরহাট প্রতিনিধি।

মন্তব্য