kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

আর বাকি ১৩ দিন

আলোচনার কেন্দ্রে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগও

শামীম আল আমিন, নিউ ইয়র্ক   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আলোচনার কেন্দ্রে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগও

২০০০ সালে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জর্জ বুশ এবং ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী আল গোরের লড়াই শেষ পর্যন্ত গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সেবার ফ্লোরিডায় দুই প্রার্থীর ভোটসংখ্যা খুব কাছাকাছি হওয়ায় স্টেটটির আইন অনুযায়ী আবারও গণনার প্রয়োজন পড়ে। দেখা যায়, মাত্র ০.০০৯ শতাংশ অর্থাৎ ৫৩৭ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন জর্জ বুশ। এই জটিলতার শেষ হয় আদালতের রায়ে। ৯ সদস্যের সুপ্রিম কোর্টে ৫-৪-এ রায় যায় জর্জ বুশের পক্ষে। ফ্লোরিডার ২৫টি ইলেকটোরাল কলেজ (তখনকার হিসাবে) পেয়ে যান জর্জ বুশ। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে দরকার হয় কমপক্ষে ২৭০টি। ফ্লোরিডার ভোটসহ জর্জ বুশ পেয়েছিলেন মাত্র একটি বেশি ২৭১টি। অন্যদিকে ফ্লোরিডার ভোট ছাড়াই আল গোরের ছিল ২৬৬টি। আর দেশজুড়ে বুশের চেয়ে তিনি পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৮ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। এর পরও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেবার দেশটির প্রেসিডেন্ট হন জর্জ বুশ।

এবারও দেশটির নির্বাচন শেষে ফল চ্যালেঞ্জ হতে পারে, যা গড়াতে পারে আদালত পর্যন্ত। বিষয়টি বিশ্লেষণ করে নিউ ইয়র্কের টেলিভিশন টিবিএন২৪-এর সঞ্চালক ও বিশ্লেষক হাবিব রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই ডাকযোগে ভোট ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছেন। এই ব্যবস্থায় জালিয়াতি হবে বলেও জোরেশোরেই বলছেন। আসলে এর মধ্য দিয়ে তিনি নির্বাচনকে বিতর্কিত করার এই রাস্তা তৈরি করে রাখছেন। হাবিব আরো বলেন, নির্বাচনী ফলাফল মনমতো না হলে ট্রাম্প আইনি লড়াইয়ে নামতে পারেন। আর এ কারণেই ভোটের আগে সুপ্রিম কোর্টের শূন্য আসনে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাস খানেকের মধ্যে নেল গোরশাচকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে বিচারপতি অ্যান্টোনিন স্কেলিয়ার মৃত্যুতে ওই পদটি শূন্য হয়েছিল। কিন্তু সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিচারপতি ম্যারিক গারল্যান্ডকে ওই পদে মনোনয়ন দিয়েও চূড়ান্ত নিয়োগ দিয়ে যেতে পারেননি প্রেসিডেন্ট ওবামা। পরে ক্ষমতায় এসে সেই সুযোগ কাজে লাগান ট্রাম্প। কেবল তা-ই নয়, নিজের প্রথম মেয়াদেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি ব্রেট কাভানাহকেও নিয়োগ দিতে সমর্থ হন ট্রাম্প।

নির্বাচনের মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিচারপতি রুথ বেদার গিন্সবার্গের মৃত্যুতে সুপ্রিম কোর্টের একটি পদ শূন্য হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণে নির্বাচনের অনেক অঙ্কই বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ডেমোক্র্যাটদের দাবি ছিল, নির্বাচন সামনে রেখে এই পদে নিয়োগ স্থগিত রাখা। কিন্তু সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে এই পদে নিয়োগ দিতে তোড়জোড় শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এরই মধ্যে মনোনয়ন দিয়েছেন বিচারপতি এমি কোনি ব্যারেটকে; নির্বাচনের আগেই এই পদে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। লক্ষ্য সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের আধিপত্যকে আরো শক্ত করা। এই তৎপরতার বিরুদ্ধে গত শনিবার ওয়াশিংটনে সুপ্রিম কোর্টের সামনে বিক্ষোভ করেছে হাজারো মানুষ।

এ বিষয়ে রাজনীতি বিশ্লেষক মোহাম্মদ মালেক মনে করেন, সিনেটে যেহেতু ৫৩টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা, তাই এই নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনিও মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল আদালতে গেলে এ থেকে অবশ্যই সুবিধা পাওয়ার আশা করছেন ট্রাম্প।

আইনজীবী মোহাম্মদ এন মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিচারপতি এমি কোনি ব্যারেটের নিয়োগ চূড়ান্ত হলে সুপ্রিম কোর্টে ৯ বিচারপতির মধ্যে রক্ষণশীল ও উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত বিচারকদের সংখ্যা হবে ৬-৩, যা দীর্ঘ মেয়াদে ডেমোক্র্যাটদের পেছনে ফেলে রাখবে। কারণ স্বেচ্ছায় অবসরে না গেলে কিংবা কারো মৃত্যু না হলে কাউকে সেই পদ থেকে সরানো যায় না।’ ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই পদে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলেও মনে করেন তিনি।

তবে তিনি এ কথাও মনে করিয়ে দেন, দেশটির সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। নিয়োগ পাওয়ার পর যেহেতু তাঁদের কারোর মুখাপেক্ষী থাকতে হয় না; তাই সুনাম, দেশপ্রেম ও পেশাদারির সঙ্গেই রায় দেন বিচারপতিরা। 

বিষয় যাই হোক, এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীলদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন রিপাবলিকানরা—এমন ধারণাই বিশ্লেষকদের।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন বলছেন, আর মাত্র অল্প কয়েক দিন পরেই নির্বাচন। ফলে সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগটি নতুন প্রেসিডেন্টের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনিসহ ডেমোক্র্যাট নেতারা জোড়ালোভাবে এই নিয়োগের বিরোধিতা করছেন।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি হচ্ছে, তিনি চার বছরের জন্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সেই মেয়াদ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ফলে তাঁর মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দেওয়াটাই তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রেসিডেন্ট বলছেন, তিনি কেবল তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। সর্বোচ্চ আদালতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কোনো অভিপ্রায় তাঁর নেই।

তবে বিচারপতি এমি কোনি ব্যারেটের মেধা ও প্রজ্ঞার বিষয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছেন না। যেমনটি বলছিলেন সাউথ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম ও কমিউনিকেশনসের অধ্যাপক ড. শফিকুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে নটর ডাম ইউনিভার্সটিতে পড়াশোনা করা এবং  পেশাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী এমি কোনি ব্যারেট। বিষয়টি হচ্ছে নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি সময়ে এই নিয়োগ না দেওয়াটা একটা রাজনৈতিক শিষ্টাচার হতে পারত।’

বিচারপতি এমি কোনি ব্যারেট সিনেট শুনানিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আগে থেকে কোনো যোগাযোগ হয়নি। যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল আদালত পর্যন্ত যায়, তাহলে তিনি কি সেই বিচার থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবেন? এই প্রশ্নটি অবশ্য এড়িয়ে যান ট্রাম্প মনোনীত এই বিচারপতি। তাঁর মনোনয়নের ওপর আগামীকাল বৃহস্পতিবার সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটিতে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা