kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

লন্ডনে রোহিঙ্গাবিষয়ক আলোচনায় বক্তারা

আইসিজের আদেশও মানছে না মিয়ানমার

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আইসিজের আদেশও মানছে না মিয়ানমার

জেনোসাইড থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে) যে অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েছিলেন মিয়ানমার তা মানছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কানাডার সহযোগিতায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত আলোচনায় তাঁরা এ মনোভাব ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ থেকে ভার্চুয়ালি ওই আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, গুরুতর দায়মুক্তি ও মিয়ানমারের প্রতি আঞ্চলিক সমর্থন অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়নবিষয়ক দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী লর্ড তারিক আহমদ বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় আইসিজের আদেশ মেনে চলতে আমরা মিয়ানমারের প্রতি আমাদের আহ্বান অব্যাহত রেখেছি।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মিয়ানমারে আসন্ন নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার জন্য ওই দেশটির নির্বাচন কমিশনকেও জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনীম বলেন, কেউ ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়নি। একমাত্র দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। তবে বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গাদের এই বোঝা বহন করা অসম্ভব। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক দাতারা এখন বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে চায়। তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কমনওয়েলথের আরো ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।

যুক্তরাজ্যে কানাডার হাইকমিশনার জেনিস শারলেট বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহির জন্য কানাডা বৈশ্বিক অঙ্গনে সরব আছে। মিয়ানমার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট, সংক্ষেপে আইসিসি) ন্যস্ত করতে নিরাপত্তা পরিষদকে কানাডা আহ্বান জানিয়েছে। তিনি আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোকে মিয়ানমারের ওপর প্রভাব খাটিয়ে আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের আহ্বান জানান।

কমনওলেয়থ মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতার প্রশংসা করে বলেন, তিনি জাতির জনকের গর্বিত কন্যা।

প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে সহযোগিতা করা সবার দায়িত্ব। জাতিসংঘ বলেছে, এটি আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নিধনযজ্ঞ।  আমাদের অবশ্যই রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, আইসিজে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে। অথচ মিয়ানমার এখনো তার আচরণ বদলায়নি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে রাখা হচ্ছে। তাদের চলাফেরার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আইসিজের আদেশ না মেনে মিয়ানমার উল্টো মিথ্যাচার করছে। মিয়ানমার এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের এলাকার প্রকৃতি বদলে ফেলেছে।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির থেকে হাসিনা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা নারী এক ভিডিও বার্তায় তাঁর ও তাঁর পরিবারের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নিপীড়নের বর্ণনা দেন।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে গঠিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রধান নিকোলাস কমজিয়ান বলেন, তাঁরা তাঁদের এখতিয়ার অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও আদালতগুলোকে সরবরাহ করছেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় তিন বছর খুব কম সময়। তবে কম্বোডিয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২৮ বছর পর। সে হিসাবে তারা যখন রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন তা এখনো জীবন্ত।

প্রখ্যাত আইনজীবী পায়াম আখাভান বলেন, জেনোসাইড হয়েছে মিয়ানমারে। তাই মিয়ানমারে জবাবদিহির জন্য আইসিজেতে যাওয়া প্রয়োজন। আইসিজে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা জেনোসাইড বন্ধ করতে বলেছেন। মিয়ানমার তা মানতে বাধ্য।

তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী, রোহিঙ্গাদের সামনে ভালো দিন আছে।’

সেন্টার ফর রেসপনসিবিলিটি টু প্রোটেক্টের নির্বাহী পরিচালক সাইমন অ্যাডামন বলেন, এক দশক আগে থেকেই মানবাধিকার পরিষদ রোহিঙ্গা জেনোসাইড বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। কিন্তু চীনা ‘ভেটোর’ ভয়ে একটি প্রস্তাবও নিরাপত্তা পরিষদ নিতে পারেনি। পুরো নিরাপত্তা পরিষদের চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখেছে গাম্বিয়া। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নির্ভর করছে।

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের সাবেক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি বলেন, ছয় বছর তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে উত্খাত পর্যবেক্ষণ করেছেন। আরসার হামলার অভিযোগে নির্মূল অভিযান চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, সমস্যা মিয়ানমারের। রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে তাড়ানোই ছিল তাদের লক্ষ্য। রোহিঙ্গাদের বসতি চিহ্নিত করার কোনো উপায়ই রাখা হয়নি। মিয়ানমার বাহিনী এখনো সেখানে অপরাধ করে চলেছে। এখন রাখাইন সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হচ্ছে।

তিনি বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে মিয়ানরমারের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এখনো নিষেধাজ্ঞার বাইরে আছেন। মিয়ানমারের পুরো সামরিক বাহিনীকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা উচিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা