kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

ডিসেম্বরের মধ্যে বইয়ের কাজ শেষ করা নিয়ে শঙ্কা

শরীফুল আলম সুমন   

২০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডিসেম্বরের মধ্যে বইয়ের কাজ শেষ করা নিয়ে শঙ্কা

প্রতিবছর অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অন্তত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কিন্তু এবার সবেমাত্র গত বৃহস্পতিবার থেকে উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিকের বই পাঠানো শুরু হয়েছে। আর চলতি সপ্তাহ থেকে পুরোপুরি শুরু হয়েছে মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ। হাতে খুবই অল্প সময় থাকলেও মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে বলছে, এতে তাদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় ডিসেম্বরের মধ্যে বইয়ের কাজ শেষ করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

করোনার প্রাদুর্ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও যথাসময়েই পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করতে চায় সরকার। বছরের প্রথম দিন যেকোনোভাবেই হোক শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে নানা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু করোনার কারণে বিলম্বে কার্যাদেশ দেওয়ায় চুক্তি অনুযায়ী মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত মুদ্রাকররা সময় পাচ্ছেন। এই অবস্থায় তাঁদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে কাজ করিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে বই পেতে চায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকের বই উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো শুরু হয়েছে। তবে করোনার কারণে এবার আমাদের কার্যাদেশ দিতেই দেরি হয়েছে। মান তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নিয়মানুযায়ী কাজ করা। সকলের সহযোগিতার মাধ্যমেই আমরা যথাসময়ে কাজ শেষ করতে চাই। আমাদের মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা রয়েছে। আমরা আশাবাদী, ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারব।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কোটি বই বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার ৫৫৫টি প্রাথমিক স্তরের। আর মাধ্যমিক, দাখিল ও ইবতেদায়ি স্তরের ২৪ কোটি ৪১ লাখ বই ছাপা হচ্ছে। গত ৫ থেকে ৮ অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিকের বই ছাপার কার্যাদেশ পায় মুদ্রনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। মাধ্যমিকের বই ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হয় সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে। এবার মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য বইয়ের প্রচ্ছদের পেছনের পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন স্থিরচিত্র ক্যাপশনসহ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ৭১টি ছবি বাছাই করা হয়। গত রবিবার এই স্থিরচিত্র চূড়ান্ত হয়। অর্থাৎ রবিবার থেকেই কাজের সময় গণনা শুরু হবে।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, বই ছাপাতে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৮৪ থেকে ৯৮ দিন পর্যন্ত সময় পেয়ে থাকে। সেই হিসাবে মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত মুদ্রাকররা ছাপার সময় পান। এ সময়ের আগে বই না দিলে জরিমানারও সুযোগ নেই।

সূত্র জানায়, এবার মাধ্যমিকের বইয়ের মান তদারককারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে ‘ইনডিপেনডেন্ট ইনসপেকশন সার্ভিসেস বিডি’। তবে এই প্রতিষ্ঠান এবারই প্রথম সরকারি বড় ধরনের কাজ পেয়েছে। আর প্রাথমিকের বইয়ের মুদ্রণ মান তদারকের কাজ পেয়েছে ‘ব্যুরো ভেরিটাস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও প্রথম দরদাতার চেয়ে ২৫ লাখ টাকা বেশি দর দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। তারা ২০১৭ সালে প্রাথমিকের বইয়ের মান তদারকির কাজ পেয়েছিল। এর পরের দুই বছর তারা মাধ্যমিকের কাজ করেছে। এবার তারা মাধ্যমিকের কাজ না পেলেও ঠিকই প্রাথমিকের মান তদারকির কাজ বাগিয়ে নেয়।

জানা যায়, আন্তর্জাতিক মান সংস্থার (আইএসও) নিয়মানুযায়ী দৈবচয়নের ভিত্তিতে কাগজের মান যাচাই করতে হবে। সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোলের স্যাম্পল সংগ্রহ করতে হবে। আগের বছরগুলোতে এই নিয়ম মানা হলেও এবার তা মানছে না মান তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের সক্ষমতার ঘাটতি থাকায় একসঙ্গে বেশি পরিমাণ কাগজ কিনতে পারছে না মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে করে বেশি কাজও করতে পারছে না তারা। কর্মীরা দক্ষ না হওয়ায় স্যাম্পল নেওয়ার সময় অনেক কাগজ নষ্ট হচ্ছে। মূলত যেসব মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবার বিনা মূল্যের বইয়ের কাজ পায়নি, সেখান থেকেই অস্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। কাগজ পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতেও দেরি হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করে একটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে যদি পাঁচবার কাগজের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে হয়, তাহলে ২০ থেকে ২৫ দিন চলে যাবে। আগে চলন্ত মেশিন থেকেই বইয়ের স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করা হলেও এবার বন্ধ করে স্যাম্পল নেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

‘ব্যুরো ভেরিটাস’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক আফজাল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই আমরা কাগজ পরীক্ষা করছি। কাগজ পরীক্ষা করতে আমাদের ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৭ সালে প্রাথমিক অধিদপ্তর আমাদের পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দেয়নি বলে যে কথা উঠেছে তা ঠিক নয়। তবে তখন বিল ছাড় করতে দেরি হয়েছিল। এবার প্রাথমিকের সর্বনিম্ন দরদাতার কাগজপত্রে ঘাটতি থাকায় আমরা দ্বিতীয় দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়েছি।’

ইনডিপেনডেন্ট ইনসপেকশনের কর্ণধার শেখ বেলাল হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের সক্ষমতা রয়েছে। আইএসও রুলসের বাইরে আমাদের যাওয়ার সুযোগ নেই। কেউ এটা না মানলে যথাসময়ে কাজ শেষ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে।’

অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বই বিতরণ কর্মকর্তা মাহফুজা খাতুন ও সংশ্লিষ্ট শাখার সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সোহাগ মিয়ার সঙ্গে মান তদারকি প্রতিষ্ঠানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মাহফুজা খাতুন একজন সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা হয়েও অধিদপ্তরে ছয় বছর ধরে লোভনীয় এই পদে চাকরি করছেন। তাঁদের যোগসাজশে এবার মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা ধরনের চাপে ফেলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে মাহফুজা খাতুনকে ফোন দিলে পরে কথা বলবেন বলে জানালেও আর ফোন ধরেননি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা