kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে সোনা আনার হিড়িক

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে সোনা আনার হিড়িক

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশফেরত যাত্রীরা হঠাৎ করেই শুল্ক পরিশোধ করে সোনার বার আনতে শুরু করেছেন। গত ১৫ দিনে শুধু দুবাই থেকে আসা যাত্রীরা ৪৫ কেজি (৩৮৭টি) সোনার বার বৈধভাবে এনেছেন। এগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা, যা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নতুন রেকর্ড।

এত দিন এই বিমানবন্দর দিয়ে শুধু অবৈধ পথেই সোনার বার আসত, যার সামান্য অংশই ধরা পড়ত কাস্টমসের হাতে। কভিড-১৯ মহামারি কাটিয়ে চট্টগ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরুর পর চোরাচালান প্রতিরোধে কড়াকড়ি শুরু করে কাস্টমস। এর পর থেকে বেশ কিছু অবৈধ সোনার চালান ধরা পড়ে। কড়াকড়ির পর থেকেই মূলত শুল্ক পরিশোধ করে সোনার বার আনার প্রবণতা বেড়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমসের উপকমিশনার রোকসানা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলছেন, মূলত বাংলাদেশ বিমানের দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটের সন্দেহভাজন যাত্রীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কারণেই শুল্ক পরিশোধ করে সোনার বার বৈধভাবে আমদানির প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘দুবাই থেকে আরেকটি বিমান সংস্থা ফ্লাই দুবাইয়ের ফ্লাইট এলেও শুধু বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটেই বৈধ ও অবৈধ সোনার বার আসার ঘটনা ঘটছে। এ জন্য ওই ফ্লাইটকে বিশেষ নজরদারি করছি। আর দেশে সোনার বাজারমূল্য বেশি হওয়াটা বৈধভাবে আমদানি বাড়ার কারণ হতে পারে।’

সোনা ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি সোনার বারের ওজন ১১৬-১১৭ গ্রাম। গতকাল শনিবার দুবাই গোল্ড মার্কেটের অনলাইন দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট মানের এক গ্রাম সোনার দাম ২১৭ দিরহাম। সেই হিসাবে একটি বারের দাম পড়ে পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ৩৪৩ বাংলাদেশি টাকা।

সোনা আমদানিতে উৎসাহ দিতে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ২০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রতি ভরি সোনা আমদানিতে বর্তমানে দুই হাজার টাকা সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়। ব্যাগেজ রুলসের আওতায় যাত্রীরাও ভরিপ্রতি দুই হাজার টাকা দিয়ে বৈধভাবে আনতে পারছেন। বিগত অর্থবছরে সোনা আমদানিতে শুল্কহার ছিল এক হাজার টাকা বেশি, ভরিপ্রতি তিন হাজার টাকা। শুল্কহার কমলেও করোনার কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু না থাকায় ব্যাগেজের আওতায় তখন সোনা আসেনি। সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু হওয়ার পর থেকেই যাত্রীরা সোনা আনা শুরু করেন। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামও বেড়েছে, সে জন্য বাড়তি আয়ের আশায় প্রবাসীরা বৈধভাবে সোনার বার আনছেন বলে জানা গেছে। কাস্টমসের হিসাবে, গত ১-১৫ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু দুবাই থেকে আসা ছয়টি ফ্লাইটে ৩৮৭টি সোনার বার শুল্ক পরিশোধ করে বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে। সেগুলোর ওজন ৪৫ কেজি। এর বিপরীতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। আর সেগুলোর বাজারমূল্য হচ্ছে ৪০ কোটি টাকা। অথচ এ সময় অবৈধ সোনার বার জব্দ করা হয়েছে ২৪২টি, যেগুলোর বাজারমূল্য ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ অবৈধ পথে চোরাচালানের চেয়ে বৈধ পথেই সোনা আমদানি বাড়ছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মুসা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী একজন যাত্রী বিদেশ থেকে আসার সময় সর্বোচ্চ দুটি সোনার বার (২৩৪ গ্রাম) শুল্ক পরিশোধ করে বৈধভাবে আমদানি করতে পারবেন। একটি সোনার বার বৈধভাবে আমদানি করতে ২০ হাজার ৬২ টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু গ্রিন চ্যানেল পার হওয়ার পর যদি ধরা পড়ে, তখন সেটি অবৈধ হয়ে যায়। তখন উল্টো সেই যাত্রীকে একটি সোনার বারের জন্য ৭০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে।

দুবাই থেকে আসা একই ফ্লাইটে যেমন অবৈধ সোনার বার ধরা পড়েছে, আবার সেই ফ্লাইটের যাত্রীদের সোনার বার বৈধভাবে আনার ঘটনাও ঘটছে।

সোনার বার আটকের তথ্যে দেখা গেছে, সর্বশেষ ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমানের দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটের আসনের নিচ থেকে ১৬০টি অবৈধ সোনার বার উদ্ধার করে কাস্টমস। যাত্রী নেমে যাওয়ার পর তল্লাশি কাজ করতে গিয়েই এসব সোনার বার পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেগুলোর বাজারমূল্য ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অথচ একই ফ্লাইটের বিমানের যাত্রীরা বিমানবন্দরে নেমে ১১৫টি সোনার বার শুল্ক পরিশোধ করে বৈধভাবে আমদানি করেছেন। এর বিপরীতে সরকার শুল্ক পেয়েছে ২৩ লাখ টাকা।

এমন কেন হচ্ছে জানতে চাইলে কাস্টমস উপকমিশনার রোখসানা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেউ হয়তো ভেবেছে বিনা বাধায় বিমানবন্দর থেকে সোনার বার নিয়ে বের হতে পারবে। কিন্তু চট্টগ্রাম পৌঁছে দেখে পরিস্থিতি উল্টো। তখন সে হয় বৈধ করবে, না হয় সিটে ফেলে রেখে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।’

চট্টগ্রাম জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি মৃণাল কান্তি ধর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈধ পথে আমদানিতে সরকারের আরো উৎসাহ দেওয়া উচিত। আর শুল্কহার আরেকটু কমানো উচিত। এতে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি দেশে সোনা চোরাচালানে নিরুৎসাহ হবে কোনো সন্দেহ নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা