kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

নবাবগঞ্জে থানা হেফাজতে যুবকের মৃত্যু

‘দুই এসআই ও ঢালীবাড়ির লোক মিলেই হত্যা’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘দুই এসআই ও ঢালীবাড়ির লোক মিলেই হত্যা’

‘ভাইরে কইছিলাম—তুই কিছু না করলেও ওরা মাইরা ফালাবো রে... তুই কোনো জায়গায় চইলা যা। ভাই কইলো, আমি কোনো দোষ করি নাই, কই পালামু? ক্যান যে ভাইরে বাড়িতে রাখতে গেছি! এহন ভাই নাই হইয়া গেল। ভাই মরলো, আমি আর বাপ হইলাম খুনের আসামি।’

আহাজারির সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার নবাবগঞ্জ থানা হাজতে মারা যাওয়া মামুন মিয়ার ছোট বোন শারমিন আক্তার রিমি। গত মঙ্গলবার হাজতের টয়লেট থেকে মামুনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা হতে পারে না। টাকা না দেওয়ায় শ্রীপুর থানা পুলিশের দুই এসআই ও ঢালীবাড়ির লোকজন মামুনকে হত্যা করেছে। আর সিসিটিভি ফুটেজ ও কিছু ছবি সামনে এনে পুলিশ বলছে, মামুন টয়লেটের গ্রিলের সঙ্গে লুঙ্গি পেঁচিয়ে ফাঁসিতে আত্মহত্যা করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এ সম্পর্কে গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাজতখানার ভেতরে কিভাবে মারা গেলেন তা আমাদের দেখার বিষয়। কেন তিনি আত্মহত্যা করলেন, তাঁকে কেউ প্ররোচনা দিয়েছিল কি না—সব বিষয়ই আমরা দেখব।’

মামুনের স্বজনরা বলছেন, পুলিশের দেখানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ভিডিওতে মামুন হাজতখানায় পানি খেয়ে টয়লেটে গিয়ে বসেন এটুকু দেখা যায়। এরপর পুলিশ ছবি দেখাচ্ছে। ছবিতে টয়লেটের গ্রিলের সঙ্গে লুঙ্গি পেঁচানো অবস্থায় মামুনের পা হাঁটু ভেঙে মেঝেতে সংযুক্ত দেখা যাচ্ছে। এভাবে পা মেঝেতে লেগে থাকলে কিভাবে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করা সম্ভব?

সরেজমিনে গতকাল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা মর্গের সামনে ভিড় করে আছেন। মেঝেতে বসে কাঁদছেন মামুনের বাবা আবুল হোসেন (৬০)। পাশেই সন্তানকে একবার দেখার আকুতি জানাচ্ছিলেন মা মাকসুদা বেগম। দুই শিশুসন্তানকে গ্রামে রেখে আসা স্ত্রী পিংকি বেগম যেন শোকে পাথর।

দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে মামুন ছিলেন মেজো। ছোট বোন শারমিন আক্তার রিমি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবার ভাইরে দুই দিনের সময় দিয়া শ্রীনগর থানার এসআই মিজান আর মালেক কইছিলো—তুই কই থেইক্কা আইনা দিবি জানি না। তুই নিছস না কে নিছে সেইটাও জানি না। তোকেই ওই মহিলারে আইনা দিতে হইবো। নইলে যে তোর কী অবস্থা করমু তুই চিন্তাও করতে পারবি না। তারাই আমার ভাইরে মারছে। লগে ঢালীবাড়ির কামরুল, রাজা আর তার বাড়ির লোকজন জড়িত।’

জানা যায়, গত রবিবার সকালে উপজেলার দেওতলার খ্রিস্টানপল্লীর বাঁশঝাড় থেকে রাজিয়া নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, পরদিন সোমবার ওই নারীর স্বজনরা মামুনকে সন্দেহভাজন হিসেবে মারধর করে শ্রীনগর থানায় সোপর্দ করে। গত মঙ্গলবার সকালে নবাবগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে তাঁকে হস্তান্তর করা হয়। থানা পুলিশ তাঁকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই ফাঁকে পরিহিত লুঙ্গি দিয়ে হাজতখানার ভেতরে টয়লেটের জানালার সঙ্গে ফাঁস দেন মামুন। পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নবাবগঞ্জ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম শেখ কালের কণ্ঠর দোহার-নবাবগঞ্জ প্রতিনিধিকে জানান, এক নারীর লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। আর ওই লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রীনগরের লস্করপুর গ্রামের মানুষ মামুনকে পিটুনি দিয়ে শ্রীনগর থানা পুলিশে সোপর্দ করে।

আসকের উদ্বেগ, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি : পুলিশ হেফাজতে মামুনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর রেশ না কাটতেই নবাবগঞ্জ থানাহাজতে মামুনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনায় আসক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা